‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা’
আমরা যে-বিষয় নিয়ে আজ আলোচনা করছি, সে-বিষয়ে আলোচনার অসুবিধের দিকটা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই কেউ কেউ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমরা অধিকাংশই রবীন্দ্রনাথের মূল ছবি দেখার সুযোগ পাই নি; রিপ্রিন্ট দেখেছি এবং তার পরিমাণও খুব বেশি নয়। রবীন্দ্রনাথ কত ছবি এঁকেছেন, এ নিয়েও একেক জন একেক রকম কথা বলেছেন। আমার মনে পড়ে, পৃথ্বীশ নিয়োগী প্রথম হিসেব দিয়েছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের ছবির সংখ্যা দুহাজারের কিছু বেশি। আজকের আলোচনায় বুলবন ওসমান উল্লেখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের ছবি হবে তিন হাজারের মতো। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, সাড়ে তিন হাজার। মনজুরুল ইসলামের বক্তব্যের ভিত্তি হচ্ছে শিবনারায়ণ রায়ের প্রবন্ধ। শিবনারায়ণ রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ ছিলেন, তিনি জানতেন, তাই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের ছবির সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার। অতএব, বোঝাই যায়, যারা রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে পূর্ণ আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন, তাঁরাও তাঁর সকল ছবি দেখেন নি বা তার সন্ধান পান নি।
আজ বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর যে-আলোচনা করলেন, তা মুখ্যত রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার শেষ পর্যায় সম্পর্কে—অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যখন রীতিমতো চিত্রশিল্পী হয়ে উঠেছেন, সেই ১৯২৮ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত আঁকা ছবি নিয়ে। এখানে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং বুলবন ওসমান দুজনেই উল্লেখ করেছেন যে, এর পূর্ববর্তী কালের যে-পটভূমি, রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার আলোচনায় তা আনা আবশ্যক। মনজুরুল ইসলাম জোর দিয়েছেন শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের জীবন এবং কবির সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে। বুলবন ওসমান রবীন্দ্রনাথের যে পকেট বইয়ের উল্লেখ করেছেন—১৮৮৯ থেকে যাতে ছবি আঁকার কাজ শুরু হয়েছিল—সেই পকেটবই রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের জীবনেরই সমসাময়িক। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে প্রথম আসেন ১৮৮৮-তে, তারপর প্রায় ১৯০১ পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় সেখানেই কাটিয়েছিলেন। পকেটবইয়ের আঁকাজোকাও ১৮৮৯ থেকে ১৯০১-এর মধ্যে। পকেটবইয়ের সব ছবি দেখতে পারলে বোঝা যেত, শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথের জীবনে যে-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তার কতটা সমকালীন স্কেচ ও ছবিতে ধরা পড়েছে।
রবীন্দ্রনাথকে যখন তাঁর ছবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন যে, ‘এই ছবি ব্যাখ্যা করার নয়, নিজেকে প্রকাশ করার ছবি: তাই ঐ ছবির মতোই আমিও মৌন হয়ে থাকলাম।’
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর প্রবন্ধের শুরুতে একটা মূল প্রশ্ন তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলাকে কোনো কোনো সমালোচক তাঁর সাহিত্যের সহোদরা বলে গণ্য করেছেন—একথা কতদূর সত্য? এই প্রসঙ্গে আমি একথাও উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করি যে, অনেক সমালোচকের মতে, রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা তাঁর সাহিত্যের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মনে হয়, প্রবন্ধের শেষ দিকে এসে বোরহানউদ্দিন বলেছেন যে সাহিত্যের নান্দনিকতা যখন ক্রমাগত রবীন্দ্রনাথের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, তখন তিনি প্রবেশ করেছেন ছবির জগতে এবং যেটা সাহিত্যে নেই, সেটা ফুটে উঠেছে চিত্রকলায়। একথাই অন্যদের কেউ কেউ বলেছেন: রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায় যে অশুভ, অমঙ্গল, ভয়ংকর ইত্যাদি স্থান পেয়েছে, তার পরিচয় নেই তার সাহিত্যকর্মে।
একই সঙ্গে বোরহান একথাও বলেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের আঁকা নারীর ছবি তাঁর দেখা নারীকে এবং তাঁর সাহিত্যের নারীচরিত্রকে মনে করিয়ে দেয়। তা যদি হয়, তাহলে বলতে হবে যে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সঙ্গে চিত্রের যে-বিচ্ছিন্নতার কথা বলা হয়ে থাকে, তা সত্য নয়। যে-অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে প্রেরণা দিয়েছে এবং যে-চরিত্র তিনি কথায় এঁকেছেন, সেই অভিজ্ঞতা ও চরিত্রকেই তিনি ধরে রেখেছেন রঙে ও রেখায়।
কথাটা ভালো করে বোঝার জন্যে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ১৯২৮-এর আগের স্কেচ ও ছবির কথা, পাণ্ডুলিপির কথা, ভেবে দেখা দরকার। গোড়ার দিকে পাণ্ডুলিপিতে যখন তিনি কাটাকুটি করছেন, তখন তাতে ছন্দজ ও সুষমারই প্রাধান্য পাই: শব্দ কাটতে গিয়ে তা ফুল-লতা-পাতা হয়ে উঠছে, একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য সৌন্দর্য সেখানে ফুটে উঠছে। অল্পকাল পরে দেখা যাচ্ছে, পাণ্ডুলিপি এমনভাবে কেটেছেন যে, একটি শব্দ বা একটি বর্ণপড়ার উপায় নেই। আর কাটাকাটি মিলে এমন এক ভয়ংকর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments