চরিত্র
গল্পকার: ফজলুল হক
হঠাৎ একটা গুলির শব্দ শুনলাম—আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা আর্ত চীৎকারের শব্দ কানে এল। চোখে দেখলাম এক ঝলক রক্ত—যা আমার জানালার পর্দাকে রঙিন করে তুলল! চোখ মুদে বুঝলাম, জানালার কাছে দাঁড়ানো রাস্তার পাগলটাকে ওরা গুলি করেছে। এখন বুঝি পাগল মারা শুরু হ’ল!
মনে হ’ল জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছি। এই বীভৎস স্বপ্ন থেকে মুক্তি পাবার জন্য ঘুমোবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘুম আসে কই? পাড়ার কোণের বাড়ি থেকে ওরা সন্ধ্যা রাতে দু’টি মেয়েকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। একটু আগে শুনেছি। ভেবেছি ওদের হত্যা করল না কেন? হত্যা করলে তো ওদের পরিবারে আর এই অশান্তির ঘূর্ণিঝড় বইত না। কারণ পরশু রাতে একটি মেয়ে...যে-মেয়েটি এই পাড়ারই কুখ্যাত ইসমাইলের পরিচিত বলে আশ্রয় পেয়েছে ঐ বাড়িতে...যে-মেয়েটির চরিত্র-সম্পর্কে সবাই সন্দিহান... শুনলাম তাকে নিয়ে যাওয়ায় কেউ কিছু মনে করেনি শুধু ঐ বাড়ির রাজিয়াকে নিয়ে যাওয়াতেই যত অশান্তি!
আমার পাড়ায় আর মেয়ে নেই। ওরা কাল চলে যাবে, সব ঠিক। কারণ ওরা কোথায় যাবে এটা ঠিক করা সম্ভব হয় নি এর আগে।
পাড়ার সবাই জানে রাজিয়া এই পাড়ার মাহবুবকে ভালবাসে। অথচ মাহবুবের খুব বেশী পছন্দ নয় রাজিয়াকে! ওরা গরীব। তবে শেষপর্যন্ত মাহবুবই তাদের গ্রামের বাড়িতে জায়গা দেবে বলে সব ঠিক করে দিয়েছে!
ওরা ফিরে আসে নি। শোনা গেছে, মেয়েদের নিয়ে গিয়ে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যায়—ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেয়... বাড়িঘর ছেড়ে যেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু ওরা এখনও ফিরে আসেনি। কাল সকাল পর্যন্ত সময় পেলে হয়তো এ পাড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটত না। কিন্তু নিয়তির পরিহাস! সবাই দোষ দিচ্ছে, ঐ ইসমাইলের ওই মেয়েটা—শাহীন সুলতানার জন্যই নাকি মিলিটারিরা ঐ বাড়িতে হানা দিয়েছিল। কারণ শাহীন সুলতানা নাকি চরিত্রহীনা। কোন এক অফিসের টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কল-গ্রহণকারিণী হ’লেও নাকি আসলে সে একজন কলগার্ল মাত্র! ইসমাইলের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক নাও থাকতে পারে; কারণ বহু মেয়েই নাকি বিভিন্ন কারণে তার কাছ থেকে প্রয়োজনমত সাহায্য পায়। ইসমাইল পাড়ার সর্দার নয়, কিন্তু তাকে ছাড়া এ পাড়ার কোন বিচার আজ পর্যন্ত হতে দেখি নি।
হঠাৎ ইসমাইল এসে আমার ঘরে ঢুকল। বিছানা ছেড়ে উঠলাম না। শুধু তার দিকে চোখ খুলে তাকালাম।
‘পাগলাচাচারে হেরা মাইরা চইলা গেছে। লাশটা উঠাইতে নিষেধ কইরা গেছে। কিন্তু আমি কি করুম মাস্টার সাব?’
জবাবে আমি কি বলতে পারি।
‘আমার যা করনের আমি করতাছি। মুসলমান হইয়া মুসলমানের লাশ রাইতে শিয়াল-কুত্তারে খাইবার দিবার পারমু না। এতে যদি হেরা আমারেও গুলী কইরা মারে—মারুক। আমার কাম আমি কইরা ফালামু।’
জানি, স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই সে ঐ লাশ সরিয়ে কবর দেবার ব্যবস্থা করেই আমার কাছে এসেছে।
ফিরে যেতে যেতে থমকে দাঁড়াল; কি যেন বলতে চাইল। এবার আমিই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইসমাইল, রাজিয়াদের খবর কিছু পেলে?’ বলবে কি বলবে না একটা ভাব দেখিয়ে ইসমাইল বলল, ‘হেই খবর আনতেই তো আমাদের দেরি হইল। বুজছেন মাস্টার সাব, এই পাড়ায় এই দুইটা কাম আমার গরহাজিরিতে হইয়া গেল। আমি থাকলে হয় জান দিতাম নয় একটারেও যাইবার দিতাম না। তবে একটা কথা কই মাস্টার সাব। এক্কেবারে সাচ্চা কথা। রাজিয়ার লগে শাহীনেরে লইয়া গেছে শুইনা অবধি খুশি হইছি।’
আমার এবার চমকানোর পালা। খুশি হয়েছে ইসমাইল! বিছানায় উঠে বসলাম। কিছু বলার আগেই ও বলতে শুরু করে—‘মাইনষে কয়, শাহীন খারাপ মাইয়া, কিন্তুক আমি ওরে পরীক্ষা কইরা দেখছি, ওর মত সাচ্চা মাইয়া নাই। হে ঐ পাঞ্জাবীগোর অফিসের অমন টেকার চাকরিও ছাইড়া দিছে। যেটারে একবার ঠিক বইলা মনে করব হেই রাস্তা থাইক্যা ওরে হটাইবার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments