এক টুকরো মাংস
পাঁউরুটির শেষ টুকরোটা দিয়ে প্লেট থেকে ময়দার তরকারির অবশিষ্টটুকু চেঁচেপুঁছে তুলে নিল টম কিঙ্। টুকরোটাকে মুখে পুরে ধীরেসুস্থে চিন্তামগ্নভাবে চিবোতে শুরু করল। খাওয়া শেষ করে টেবিল থেকে ওঠার পরেও মনে হচ্ছে খিদেটা মেটেনি। তবু তো বাড়ির মধ্যে ও একাই আজ খেয়েছে। ছেলে দুটোকে আগেভাগে ঘুম পাড়িয়ে পাশের ঘরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে—যাতে ওরা খেতে পায়নি বলে চেঁচামেচি না করে। টমের স্ত্রী মুখে কিছু ঠেকায়নি। চেয়ারে বসে স্নেহ-ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রমিক ঘরের মেয়ে টমের বউ। শুকনো রোগা চেহারা, কিন্তু তবু মুখ থেকে লাবণ্যটুকু এখনো পুরো মুছে যায়নি। তরকারির জন্যে ময়দাটা সে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করে এনেছিল। শেষ পুঁজি দুটো আধ পেনি খরচ হয়েছে পাঁউরুটি কিনতে।
ওর জানালার পাশে রাখা একটা অতি রুগ্ন চেয়ারের উপর বসামাত্র চেয়ারটা টমের ভারের প্রতিবাদে কঁকিয়ে উঠল। মেশিনের মতো অভ্যাসবশত পাইপটা মুখে গুঁজে কোটের পাশ-পকেটে হাত পুরে দিল টম। পকেটে তামাক না পেয়ে তার হুঁশ ফিরল। নিজের ভুলো মনের কথা ভেবে ভুরু কুঁচকে পাইপটা মুখ থেকে সরিয়ে নিল। নড়াচড়ার ব্যাপারটাই কেমন মন্থর। যেন নিজের পেশীর ভারে নিজেই কাবু। পাথরের চাঁইয়ের মতো বিশাল দেহের অধিকারী টম কিঙ্। সস্তা কাপড়ের ঢলঢলে প্যান্টশার্টগুলো বহুদিনের পুরোনো। জুতোর তলায় অনেকদিন আগেই সুকতলা মারা হয়েছে, উপরের চামড়াও ছিঁড়ব ছিঁড়ব করছে। দু-শিলিঙ দামের সুতির শার্টের কলারটা ফাটা। সারা জামায় রঙের দাগ। কাচলেও উঠবে না।
কিন্তু এসবই গৌণ। টম কিঙের সত্যিকার পরিচয় পেতে হলে ওর মুখের দিকে তাকাতে হবে। তাহলেই নিঃসন্দেহে বলা যাবে ও একজন পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা। চারচৌকো দড়ি-বাঁধা রিঙের মধ্যে জীবনের বেশ কিছু বছর সে পার করেছে, আর তারই দৌলতে তার মুখখানা আজ যোদ্ধা পশুর মতোই চিহ্নিত। সত্যি, মুখখানা দেখলেই মেজাজ বিগড়ে যাবার কথা। তার উপর আবার পরিষ্কার করে দাড়ি কামানোর জন্যে মুখের প্রতিটি রেখা যেন আরও কুৎসিত ভাবে আত্মপ্রচার করছে। মুখের মধ্যে একটা ক্ষতচিহ্নের মতো কদাকার ঠোঁট দুটো থেকে যেন মাত্রাতিরিক্ত রুক্ষতা ঝরে পড়ছে। ভারী ভারী চোয়াল দুটোয় পাশবিক একটা আক্রোশ জমে আছে। লোমশ ভুরুর তলায় অলস মন্থর ভাবাবেগহীন দুটো চোখ। নিছক পশু হিসেবে সনাক্ত করার পক্ষে সবচেয়ে সহায়ক ওর অনুভূতিশূন্য চোখ দুটো। নিদ্রাতুর চোখ দুটো যেন সিংহের মতো—শিকারী জন্তুর যেমন হয়। কপালের দিকটা ঢালু হয়ে উঠে গেছে। কদমছাঁট চুলের তলার এবড়ো-খেবড়ো মাথাটা পাক্কা বদমাইশের মতো দেখায়। নাকটা দুবার ভেঙ্গেছে আর অসংখ্য আঘাতে যথেচ্ছ একটা আকার নিয়েছে। কান দুটো আকারে দ্বিগুণ হয়ে ঠিক ফুলকপির মতো ফুলে আছে। এত অলঙ্কারের পর আবার সদ্য-কামানো মুখে দাড়ির আভাস একটা নীলচে কালো ছোপ ফেলেছে।
মোটের উপর অন্ধকার গলিতে বা নির্জন জায়গায় হঠাৎ ওর মুখোমুখি হলে যে-কেউ ভয় পেতে পারে। কিন্তু তবু টম কিন্তু অপরাধী নয়। আজ অবধি কোন অপরাধই সে করেনি। দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত মামুলি ঝগড়াঝাঁটির কথা বাদ দিলে কারুর কোন অনিষ্ট সে করেনি। গায়ে পড়ে ঝগড়া করাটা অবধি তার স্বভাবে নেই। ও পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা। কাজেই ওর চরিত্রের পাশবিক অংশটুকু পেশাদার লড়াইয়ের মঞ্চের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রিঙের বাইরে টম কিন্তু সাদাসিধে মানুষ, কারুর সাতেপাঁচে নেই। অল্পবয়সে যখন প্রচুর রোজগার করেছে, নিজের ভালোমন্দ বিচার না করেই পাঁচজনের জন্যে অঢেল করেছে। কারুর উপর ওর যেমন কোন বিদ্বেষ নেই, তেমনি ওরও কোন শত্রু নেই বললেই চলে। লড়াইটা ওর কাছে একটা ব্যবসা। রিঙের মধ্যেও আঘাত হানে যখন, ধ্বংস করবার জন্যেই হানে। বারুদ্ধ করবার জন্যেই হানে। কিন্তু তার মধ্যে কোন ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কাজ করে না। এটা সাদাসিধে লেনদেনের ব্যাপার। লোকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments