উপজাতির ক্ষতচিহ্ন অথবা ডোতেই কর।
সেম্বেন উসমান
সন্ধোবেলাগুলো আমরা যেতুম মেন্-এর ওখানে; সেখানে পুদিনা মেশানো চা খেতে-খেতে কত বিষয়ে কথা হ’তো আমাদের—যদিও অনেক বিষয়েই আমাদের জ্ঞান ছিলো সামান্য। কিন্তু ইদানীং আমরা বড়ো-বড়ো সমস্যাগুলো এড়িয়ে যেতুম—যেমন বেলজিয়ান কঙ্গোর কথা, মালি যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডগোলের বিষয়, আলজেরিয়ার স্বাধীনতার লড়াই অথবা জাতিপুঞ্জের পরবর্তী অধিবেশনের কথা। তার কারণ ছিলো সেয়ার, বেশির ভাগ সময়েই যার মাথা থাকতো ঠাণ্ডা, আর যার স্বভাবটা ছিলো গম্ভীর। প্রশ্নটা সে-ই তুলেছিলো। ‘আমাদের জাতের লোকের গায়ে ও-রকম জখমের দাগ থাকে কেন?’
(এখানে আমার যোগ করা উচিত যে সেয়ার ছিলো আধা-ভোলতেইক, আধা-সেনেগালি; কিন্তু তার নিজের গায়ে কোনো জাতিগত ক্ষতচিহ্ন ছিলো না।)
আমাদের সকলের মুখে যদিও ও-রকম কোনো ঘায়ের দাগ ছিলো না, তবু আমি কখনো ও-রকম উত্তেজিত আলোচনা শুনিনি—শুনিনি ও-রকম অনর্গল কথা—অন্তত যদ্দিন ধরে আমরা মেন্-এর বাড়িতে আড্ডা দিতে যাচ্ছিলুম। আমাদের কথা শুনে যে-কারও মনে হতে পারতো যে গোটা আফ্রিকা মহাদেশের ভবিষ্যৎটাই বুঝি বিপন্ন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে রোজ সন্ধ্যেয় যত অদ্ভুত-অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা হ’তো। আমাদের মধ্যে কেউ-কেউ তো আশপাশের গাঁগুলোয়—এমনকি আরো দূরেও—চলে যেতো, গাঁওবুড়ো আর পুরুতদের সঙ্গে আলোচনা করবার জন্য—-তাদেরই কিনা এ-অঞ্চলের ‘জ্যান্ত বিশ্বকোষ’ বলে ধরা হ’তো। তারা যেতো শুধু এই রহস্যটার গভীরে তলিয়ে দেখবার জন্য—কেননা এটা মনে হচ্ছিলো যে এই ক্ষতচিহ্নের ব্যাপারটা কোনো সুদূর অতীতে প্রোথিত হয়ে আছে।
সবগুলো ব্যাখ্যাই যে ভুল, এটা সেয়ার বুঝিয়ে দিতে পারলো।
কেউ-একজন তীব্রস্থরে বলেছিলো যে, ‘এটা হলো বংশগরিমার চিহ্ন;’ আরেকজন বলেছিলো, ‘এটা দাসত্বের প্রতীক।’ তৃতীয় আরেকজন ঘোষণা করেছিলো যে, ‘এটা নিছকই একটা শোভার চিহ্ন—এককালে এমন-এক জাতি ছিলো যারা গায়ে-মুখে এই বিশেষ চিহ্নগুলো না-থাকলে কোনো ছেলেমেয়েকেই বিয়ে করতো না।’ আরেকজন তাঁড় গম্ভীর সুরে বলেছিলো: ‘একদা আফ্রিকার কোনো ধনী সর্দার তার ছেলেকে ইওরোপে লেখাপড়া শিখতে পাঠিয়েছিলো। সর্দারের ছেলে যখন দেশ ছেড়ে চলে যায়, তখন সে ছিলো নেহাৎই ছেলেমানুষ—যখন ফিরে এলো, তখন সে প্রাপ্তবয়স্ক। তো আমরা বলতে পারি যে সে ছিলো শিক্ষিত—একজন বুদ্ধিজীবী। সে তার নিজের জাতের লোকদের আর সব প্রথা-পার্বণকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে দেখতো। এতে তার বাবা খুব বিরক্ত হয়ে পড়েন—কী করে তাকে বংশমর্যাদা বিষয়ে অবহিত করে ফিরিয়ে আনা যায়, এটাই তিনি ভাবতে থাকেন। তাঁর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি পরামর্শ করেন। আর শেষকালে, একদিন সকালে, গাঁয়ের বড়ো চত্বরটায় সকলের চোখের সামনে ছেলেটির মুখে ঐ কাটার দাগগুলো তৈরি করে দেয়া হয়।’
কেউ তার গল্পটা বিশ্বাস করলো না বলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বক্তা শেষটায় তার মতটা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলো।
আরেকজন কে বললে ‘আমি ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউটে গিয়ে বিস্তর বই ঘেঁটেছি, কিন্তু এ-ব্যাপারে কিছুই বার করতে পারিনি। তবে, এইটুকু জেনেছি যে যারা বড়ো-বড়ো চাকরি করে তাদের বৌরা তাদের মুখ থেকে এই দাগগুলো তুলে ফেলছে; তারা ইওরোপে গিয়ে ডাক্তারদের পরামর্শ নেয়। কারণ আফ্রিকার সৌন্দর্যবোধের নতুন বিধিগুলো দেশের সব পুরোনো ঐতিহ্যকে তাচ্ছিল্য করে; মেয়েরা সব মার্কিনমার্কা হয়ে আছে। নিউ-ইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের কালা আদামীদের প্রভাব ছড়াচ্ছে এরা। আর এই ঝোঁকটা যত বাড়তে থাকবে, জাতির গায়ের এই ক্ষতচিহ্নগুলো ততই তাদের অর্থ আর গুরুত্ব হারিয়ে বসবে—এবং শেষে একদিন এ-সব চিহ্ন একেবারেই উধাও হয়ে যাবে।’
আমরা এই চিহ্নগুলোর বৈচিত্র্য নিয়েও অনেক আলোচনা করেছিলুম। এমনকি এক জাতের লোকের মধ্যেও যে কত রকম ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়।
সারা গায়ে যেমন কাটার দাগ, তেমনি আবার মুখেও। এই প্রসঙ্গে একজন জিগ্যেস করলে: ‘এই দাগগুলো যদি সত্যিই বংশগরিমার চিহ্ন হয়, অথবা উঁচু বংশ নিচু বংশের তফাৎ বোঝায়, তবে আমেরিকার দেশগুলোয় কেন কোনোদিন তাদের দেখা যায় না?’
‘হুম্। এতক্ষণ শেষ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments