রবীন্দ্রনাথ ও লোকসাহিত্য
বিবিক্ত, বিষণ্ন ও ভয়াবহভাবে নির্জন এই কালে লোকসাহিত্যের চর্চা, পঠন-পাঠন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের চেতনার শরীরে স্নিগ্ধ মধুর প্রলেপের মতো। লোকসাহিত্যের সরল সহজ অনাড়ম্বর পৃথিবী একমাত্র ঠাঁই যেখানে মুখ লুকোবার মতো জায়গা আছে, অন্তত পিতৃমাতৃহীন এ-যুগে। লোকসাহিত্যের মধ্যে যুক্তিশাস্ত্রের নিয়মকানুন মানবার তেমন আয়োজন নেই অথচ শুধু তারই ভিতরে পর্যাপ্ত হৃদয় একেবারে ছড়িয়ে আছে, আর সেখানেই আমরা পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সংলাপে স্নিগ্ধ হতে পারি। একালের ধূসর সৃষ্টিহীন মুহূর্তে লোকসাহিত্য দেশের বিপুল জনসাধারণের সঙ্গে একাত্ম হতে শেখায়, আমাদের একাকিত্ববোধ, স্বল্পকালের জন্য হলেও, মুখর জনকণ্ঠের মধ্যে হারিয়ে যায়, ব্যক্তির আলাদা নির্জন অস্তিত্ব জন-অস্তিত্বের স্বাদ পায়, তদুপরি দেশ-কাল-পাত্রের দিগ্বলয় বিশ্ববলয়ের মধ্যে স্থিতি পায়, আমাদের বিষাক্ত প্রতিহত অবমানিত অবহেলিত, প্রহারে প্রহারে জর্জরিত চেতনা অকস্মাৎ আত্মীয়তার সন্ধান পায়, মানবিকতার বিশ্বজনীন অবস্থিতি আমাদের মন কাড়ে।
রবীন্দ্রনাথ যে-মুহূর্তে লোকসাহিত্যের গভীরতর চর্চায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি এসব কথা ভেবেছিলেন কি না জানি না। কিন্তু যেহেতু সব চেতনাই আসলে সমকালীন চেতনা সেহেতু আমরা এমন করে ভাবি। নিদারুণ বৃষ্টিপাত, ভয়ংকর খরা, ধ্বংসমুখী কালবোশেখি, এবং অর্থনৈতিক মন্দা যে-দিনে দৈনন্দিন ঘটনা তখন আমরা এ রকম ভাবি। আমাদের উপলব্ধ যন্ত্রণাই সেজন্য সবকিছু বিচারের মানদণ্ড অর্থাৎ তীব্র স্নায়বিক জ্বালা, অন্তর্দ্বন্দ্বে নিহত হৃদয় এবং সহৃদয় ঈশ্বরের অনুপস্থিতি আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথের কাল থেকে পৃথক করে দিয়েছে, ফলে রবীন্দ্রনাথের বিচারও আমরা করি আমাদেরই চেতনার আলোকে। ঐতিহাসিক ও সমকালীন চেতনার সমন্বয়ে যথার্থ সাহিত্য-বিচার সম্ভব।'
আমাদের দেশের ইতিহাস প্রয়োজনের মধ্যে নয়, মানুষের অন্তরের গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেচে। বাউল-সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি—এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েচে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি।
একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, কোনো সাহিত্যই স্বয়ম্ভূ নয়। প্রত্যেক সাহিত্যের মূল রসস্রোত একদিকে যেমন ব্যক্তির, অন্যদিকে তেমনি ব্যক্তির মাধ্যমে সমাজের মানসলোক থেকে উৎসারিত। একটি সমাজ আবার সমগ্র মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সেদিক থেকে ব্যক্তির সাহিত্যে যেমন একটি সমাজের ও একটি দেশের হৃদয়বাণী ধরা পড়ে, তেমনি তার সৃষ্টির মাধ্যমে, যদি সে-সৃষ্টি তার হৃদয়ের অকৃত্রিম আনন্দ-বেদনার অনুভূতিতে অভিষিক্ত হয়, সমগ্র মানবসমাজের অব্যক্ত কথা যেন বাণীরূপ লাভ করে। সেজন্যই সাহিত্য-স্রষ্টার হৃদয়-মুকুরটি তাঁর নিজের এবং সমাজের তথা বিশ্বের ছায়া প্রতিবিম্বিত হবার মতো সমুজ্জ্বল ও প্রশস্ত—তাঁর অনুভূতির ও মননের ক্ষেত্র তাঁর নিজের, সমাজের ও বিশ্বের জীবনালেখ্যরূপ বীজকে পূর্ণাঙ্গ জীবন-ফসলে গড়ে তুলবার উপযুক্ত উর্বরতায় সমৃদ্ধ। এই কথাগুলো চিন্তা করেই সাহিত্যকে জীবনের দর্পণ বা সমাজের প্রতিবিম্ব বলে উল্লেখ করতে কোনো বাধা দেখি না। আবার এই কথাগুলো স্মরণ রেখেই বলতে হয়, আজকের ব্যক্তি বা সমাজ শুধু আজকের সৃষ্টি নয়। সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তির স্বাস্থ্যে, গঠনপ্রকৃতিতে, রক্তে, ভাষায়, মননে এবং সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা-চালচলনে অতীত রয়েছে—রয়েছে অনেক কালের অনেক ওঠানামার পথ পেরিয়ে তার আজকের যুগে বা কালে উত্তরণের একটি চলিষ্ণু ধারা একটি বিবর্তনের অবিরাম প্রবাহ। এই প্রবাহের গুঞ্জনধ্বনি কবি তাঁর রক্তে তাঁর মর্মে অব্যক্ত ভাষায় অনুরণিত হতে শোনেন :
তব সঞ্চার শুনেছি আমার মর্মের মাঝখানে,
কত দিবসের কত সঞ্চয় রেখে যাও মোর প্রাণে,...
তুমি জীবনের পাতায় পাতায় অদৃশ্য লিপি দিয়া
পিতামহদের কাহিনী লিখিছ মজ্জায় মিলাইয়া।
ফ্রস্টের ভাষায় :
It is from that water we were from
Long, long before we were from any creature
Here we, in our impatience of the steps,
Get back to the beginning of the beginnings…
It flows with us. It flows between us
To separate us for panic moment
It flows between us, over us and with us.
এই যে অতীত,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments