রবীন্দ্রনাথ: তাঁর প্রিয়সঙ্গিনী পদ্মা
নদী কিংবা প্রবহমান জলধারাকে নানারূপে ও প্রতীকে তুলে ধরার চেষ্টা বাংলাসাহিত্যে এক ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। কবিতা, গান, ছোটগল্প ও উপন্যাসে একাধিক লেখকের হাতে নদী নানা ভূমিকায় উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথসহ পরবর্তী যুগের আধুনিক কবিদের অনেকে এই বিশেষ দিকে তাঁদের মেধা ও সময় ব্যয় করেছেন। আধুনিকদের মধ্যে এ বিষয়ে কবি বিষ্ণু দে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।
নাম উল্লেখ না করে বলা যায় এদের মধ্যে কেউ চঞ্চলা জলস্রোতে গতির সৌন্দর্য বা বেগের আবেগ লক্ষ করে অভিভূত, কেউ উদাসী জলধারায় মল্লার বা টোড়ির বিষণ্ণতা অনুভব করেন। আবার কেউ নদীস্রোতের উজান-ভাটিতে জীবনের তাৎপর্যময় রূপ খুঁজে পান এবং সে ধারায় ভেসে সচ্ছল জীবনের উন্মুক্ত পত্তনে পৌঁছাতে চান। অন্য কেউ নদীকে জীবনপ্রবাহের গতিময়, মুক্ত উৎস এবং শুদ্ধজীবনের গন্তব্য বলে বিবেচনা করেন।
“বাস্তবিক, পদ্মাকে আমি বড়ো ভালোবাসি। ...ওর পিঠে এবং কাঁধে হাত বুলিয়ে ওকে আমার আদর করতে ইচ্ছে করে। ...আমার পক্ষে সত্যিকার একটি স্বতন্ত্র মানুষের মতো।”
রবীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে বা আহসান হাবীবের মতো একাধিক কবি নদী ও জলস্রোতকে তাদের কবিতায় এ ধরনের নানা প্রতীকে, ভাষ্যে তাৎপর্যময় করে তুলেছেন। অন্যদিকে কথাসাহিত্যিকও পিছিয়ে থাকেন নি। তবে তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রমুখ যারা নদী ও মানবীয় জীবনযাত্রার মধ্যকার সম্পর্কটি সার্থক শিল্পভাষ্যে প্রতিফলিত করে তুলেছেন। পরবর্তীকালে আরো কেউ কেউ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ভর করে ঐ একই পথে হেঁটেছেন।
পরিণত যৌবনে রবীন্দ্রচেতনায় পদ্মা ও বাংলাদেশের আরো কয়েকটি নদী—যেমন ইছামতি, গড়াই, আত্রাই বা নাগর এবং গ্রামবাংলার নিসর্গ সৌন্দর্য যে শৈল্পিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তা শুধু ‘ছিন্নপত্রাবলী’তেই লিপিবদ্ধ নেই, সে অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের বহুবিধ রচনায়, বিশেষ করে কবিতায় ও গানে। পদ্মাপর্বের কবিতাবলি ও গান রবীন্দ্রসৃষ্টির ধারায় এক অবিস্মরণীয় বাঁকফেরা গুণগ্রামে চিহ্নিত।
যেমন কবিতায়, কখনো গানে, পত্রাবলিতে বা লঘুপ্রবন্ধে তেমনি আধুনিক ছোটগল্পের সূচনামাহাত্ম্যেও পদ্মার গতিময় সৌন্দর্যের পটভূমি ও তীরবর্তী জনপদজীবনের বৈচিত্র্যলীলা রবীন্দ্রচেতনায় অশেষ সাহায্য যুগিয়েছে। যেমন তার ব্যক্তিজীবনে তেমনি শৈল্পিক সৃষ্টিতে পদ্মা ও পারিপার্শ্বিক নিসর্গরূপের প্রভাব ব্যাপক ও গভীর। এ প্রভাব রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অন্তরে লালন করেছেন। পদ্মার স্মৃতি তাঁর জন্য ছিল প্রিয় স্মৃতি।
সঙ্গত কারণে প্রমথনাথ বিশী তাই লিখেছেন: “বাস্তবিক, রবীন্দ্রনাথের মতো মহাকবির দৃষ্টিতে পদ্মাকে আর কেউ দেখে নি। বছরের পর বছর, ঋতুর পর ঋতু পদ্মাকে নিরীক্ষণ ক’রে তিনি তার বিশ্বরূপ দর্শন করতে সমর্থ হয়েছেন। চর্মচক্ষের দৃষ্টির সঙ্গে ক্রমে যুক্ত হয়েছে কল্পনার দৃষ্টি ও দিব্যদৃষ্টি। এই তিন দৃষ্টির সম্মুখে পদ্মা উদ্ঘাটিত করে দিয়েছে তার অপার রহস্য,... সেতো অপেক্ষা ক’রে ছিল এমন একজন মহাকবির জন্যে কবির চোখে ভাবুকের চোখে প্রেমিকের চোখে যে তাকে দেখতে চাইবে।”
উল্লিখিত বক্তব্যে সামান্যতম অতিরঞ্জন নেই। একই সঙ্গে একথাও সত্য যে নাগরিক কবি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিপ্রতিভা সীমাবদ্ধতার বৃত্ত থেকে মুক্তি পেল পদ্মাতীরে এসে। সম্ভব হলো প্রাকৃত সৌন্দর্যের পটভূমিতে গ্রামীণ জীবন—জনপদের বিচিত্র রূপ জানা, চেনা ও বোঝা। এই জানা ও চেনার নানান চেহারা, নানান চরিত্র। তা কখনো চমকপ্রদ ও অভাবিত, কখনো রীতিমত বেদনাদায়ক। এ অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যকর্মে, বিশেষত কবিতায়—গানে দান করেছে অসামান্য বাঁকফেরা অভিনবত্ব, গভীরতা ও বৈচিত্র্য। আবারো প্রমথনাথ বিশীর ভাষায় “কলকাতার নাগরিক সন্তানকে মহাকবির পদবী দান করলো বাংলাদেশের জনপদ আর নদনদী ঋতুভেদে বিচিত্র দৃশ্যাবলী।” বলাবাহুল্য এর কেন্দ্রবিন্দু পদ্মা।
পদ্মাতীরে এসে কবি রবীন্দ্রনাথ জীবনস্রোতকে দেখে নেন ভিন্ন রূপে জলস্রোতের বিচিত্রগামিতার সঙ্গে মিলিয়ে, বুঝে নিতে পারেন প্রকৃতির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা জীবনধারার চিরকালীন ছন্দময়তার বিষয়টি। সেক্ষেত্রে জলস্রোত ও জীবনস্রোতের মধ্যে কোনো তফাত নেই। সহজ, সরল, আটপৌরে গ্রামীণ জীবনের পাশাপাশি রোদেলা চকচকে বা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments