রবীন্দ্রসাহিত্যে সুফিপ্রভাব
রবীন্দ্রসাহিত্য বিরাট মহাসাগরের মতো। তার কোথায় কি আছে, কোথায় কত গভীরতা এসব নির্ণয় করা যেমন-তেমন কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের কোনো এক কবিতায় তিনি তাঁর অনবদ্য ভঙ্গিতে অজানা বন্ধুকে যা বলেছিলেন, তার মর্মার্থ অনেকটা এই : হে বন্ধু, লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমাকে চিনি কিনা? আমি গর্ব করে বলি ‘হ্যাঁ চিনি।’ কিন্তু তারা যখন জিজ্ঞাসা করে তুমি কেমন? তখন কি যে বলবো, বুঝতে পারিনে ; কেবল বলি কি জানি? তারা তখন বিদ্রূপের হাসি হেসে চলে যায়। দেখ, আমি যে তোমাকে একেবারে চিনিনে তাই বা কেমন করে বলি? কত সকাল-সন্ধ্যা-দুপুরে আভাসে-ইঙ্গিতে হৃদয়ে তোমার স্পর্শ পেয়েছি, অভিভূত হয়েছি, কিন্তু নিশ্চয় করে ত কিছুই বলতে পারিনে। মোদ্দা কথা, আমি চিনিও আবার চিনিও না।
আমার অবস্থাও আজ ঠিক তাই। ভেবেছিলাম অনেক কথাই বুঝি জানি, কিন্তু কাজের সময় তার প্রমাণ দিতে গিয়ে শরম পাই। প্রথমত, পঞ্চাশ বছরের অধিককাল ধরে যা সব পড়েছি, তার আবছায়াটা মনে আছে—আর খুব সম্ভব তাঁর সমগ্র রচনার অন্তত এক তৃতীয়াংশ এখনও পড়বার বাকি রয়েছে। আর যা পড়েছি তা-ও পড়ার মতো পড়তে পারি নি। দ্বিতীয়ত, সুফিপ্রভাব বলতে সত্যি কি বুঝায়, তাও স্পষ্ট করে ধারণা করতে পারি নি। তাই একটা যেমন-তেমন ধারণা খাড়া করেই আরম্ভ করতে হচ্ছে।
"আমার বিশ্বাস আমাদের সব স্নেহ সব ভালবাসাই রহস্যময়ের পূজা—কেবল সেটা আমরা অচেতনভাবে করি। ভালবাসা মাত্রই আমাদের ভিতর দিয়ে বিশ্বজগতের অন্তরস্থিত শক্তির সজাগ আবির্ভাব।"
মনে হয় রবীন্দ্রনাথ যে বলেছেন কোনো পরমপুরুষ বা জীবনদেবতা বা চিরপরিচিতা মানসী—যাকে চিরকাল ধরে অনুভব করলেও পুরোপুরি বোঝা যায় না, তার অনুসন্ধান সুফি মনোবৃত্তির গোড়ার কথা, আর সেই পর্যায়ের ভাব যে সাহিত্যে বিধৃত হয়, তাই সুফি-সাহিত্য বা সুফি-প্রভাবিত সাহিত্য। এইখানে প্রশ্ন জাগে—তাহলে কীর্তন, বৈষ্ণব সাহিত্য, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি, বাউল ইত্যাদির সঙ্গে সুফি-সাহিত্যের পার্থক্য কোথায় ? এসব দার্শনিক মতবাদের সূক্ষ্মতার ভিতরে প্রবেশ না করে শুধু এইটুকু বলতে চাই, এসবের ভিতরে হয়তো আঙ্গিকের পার্থক্য আছে, গভীরতার পার্থক্য আছে, ভাবাদর্শের পার্থক্য আছে, তবু এদের ভিতর আত্মীয়তার সূত্র রয়েছে,—সেই গভীরের অতল ভালোবাসায়। এই গভীরকে পাবার সুদূরের পিপাসাকেই আমি বিভিন্ন নাম না দিয়ে একটা নাম দিয়ে চিহ্নিত করবো—সুফি মনোভাব। অবশ্য অন্য নামও দেওয়া যেত। মৌলানা রুমীকে (১২০৭–১২৭৩খ্রি.) সুফিদের আদি কবি ধরলে দেখা যায় বৈষ্ণব সাহিত্য তার অন্তত দুই শতাব্দী পরে জন্ম নিয়েছে। তাইতে জ্যেষ্ঠ হিসাবেও সুফিদের অগ্রবর্তী দাবি রয়েছে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-কাহিনী আরও অনেক প্রাচীন, তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু কীর্তন ও বাউল, আমরা বর্তমানে যে-রূপে পাচ্ছি, তা ঠিক কখন প্রবর্তিত হয়েছিল তা আমার জানা নেই। বাংলা ভাষায় বর্তমানে আমরা যে ভাটিয়ালি ও মুর্শিদি গানের সঙ্গে পরিচিত তার উৎপত্তিকালও অন্ধকারে আচ্ছন্ন; হয়তো দুই শতাব্দীর অধিকপূর্বে নয়। আর এও দেখা যায় যে পঞ্চদশ শতাব্দীর আগেই বাংলাদেশে রুমীর মসনভী, শেখ সাদীর গুলিস্তাঁ বোস্তাঁ-পান্দনামা, দেওয়ান হাফিজ-এর গজল ইত্যাদি বেশ চালু হয়ে পড়েছিল। সুতরাং বাংলাদেশের মানস-চিত্তে ফারসি কালচারের একটা স্পষ্ট ছাপ থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়। বিশেষ করে, বাংলার জনসাধারণ রামায়ণ-মহাভারত প্রভৃতি মহাগ্রন্থকেও লৌকিক ভাষায় পেয়েছিল, মুসলিম শাসনের আগে নয়। তার আগে পৌরাণিক কাহিনী প্রভৃতি জনসাধারণের মধ্যে কত গভীরভাবে সঞ্চারিত হয়েছিল তা বলা যায় না ।
যা হোক, এখন রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রাবলী, কথিকা, ছোটগল্প, উপন্যাস, কাব্য-নাটক ও অন্যান্য রচনার মধ্যে যে-সব স্থলে উপরোক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘সুফিভাবের’ সমগোত্রীয় ভাবের সাক্ষাৎ মেলে, তার থেকে অল্প কয়েকটি নমুনা দিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক। অবশ্য হাজার চেষ্টা করেও অসম্পূর্ণতার হাত এড়ানো যাবে না—আগের থেকেই সাফাই দিয়ে রাখা ভালো।
ছিন্নপত্রাবলী, শিলাইদহ, ১ অক্টোবর ১৮৯১
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments