রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন
বৈশাখে আমি বাংলাদেশে আসি এবং বাংলা একাডেমীর একটি সভা দিয়ে আমার এখানকার কার্যক্রম শুরু হয়। আবার বাংলা একাডেমীর সভা দিয়েই দেখছি আমার এখানকার কার্যক্রম শেষ হতে চলেছে। কাল সকালে আমার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা। বাংলা একাডেমীকে, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাবার এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। আপনারা যাঁরা আজকের এই সভায় উপস্থিত আছেন—তাঁদের সবাইকেও এই সঙ্গে আমার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের সভার বিষয় বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মহাশয় এইমাত্র আপনাদের জানিয়েছেন।
এমন একটি ব্যক্তি অথবা সত্তাকে যদি কল্পনা করা যায় তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর তবে তাঁর শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষার তাঁদের প্রয়োজন যারা সম্পূর্ণ নন। জন্মসূত্রেই সম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর কোনো সত্তার শিক্ষার প্রয়োজন হয় না। আবার এমন একটি ব্যক্তি অথবা সত্তাকে যদি চিন্তা করা যায় যিনি অসম্পূর্ণ, অপূর্ণ, কিন্তু যাঁর নিজেকে নতুন করে গড়বার শক্তি একেবারেই নেই—তবে তাঁর শিক্ষা গ্রহণের শক্তি নেই। কাজেই তাঁর পক্ষেও শিক্ষা নিষ্প্রয়োজন। একদিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ আর অন্যদিকে সেই অপূর্ণ মানুষ, যে নিজেকে গড়বার শক্তি লাভ করে নি, নতুন করে ক্রমে ক্রমে সৃষ্টি করবার শক্তি যার নেই, এই দুইপ্রান্তে শিক্ষা নেই, এর মাঝামাঝি জায়গাতে শিক্ষার স্থান। যিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ নন—নিজেকে পূর্ণ করবার জন্যে তাঁর অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। কাজেই শিক্ষার মূলে এই রকম একটা সম্পর্কের কথা আছে। এবং সেই সম্পর্ককে গড়ে তোলবার, বিশেষ পথে বিশেষ পদ্ধতিতে রূপদান করবার, প্রশ্ন আছে।
“রাজনীতিসচেতন হয়েও শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গণে তিনি দলীয় রাজনীতিকে ঢুকতে দিতে চাইতেন না... শিক্ষাকে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখাটাই মঙ্গলজনক।”
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনের মূলেও এই রকম কিছু সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণা আছে। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে বিশ্বমানবের সম্পর্ক—এই রকম কতগুলো সম্পর্কের ধারণা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনের মূলে আছে। প্রকৃতি নিয়েই কথাটা শুরু করা যাক। কারণ রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যাঁদের কোনো না কোনোভাবে পরিচয় আছে—তাঁদের মনে এই কথাটাই স্পষ্ট যে শিক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথ এমন একটি স্থান বেছে নিয়েছিলেন—যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একটা নিবিড় সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারবে। এখন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে সম্পর্ক অথবা মানুষ এবং প্রকৃতিকে নিয়ে শিক্ষার যে ধারণা, এই সম্পর্ক, অথবা, এই ধারণার আবার দুটি প্রান্ত আছে—সেই দুটি প্রান্ত নিয়ে একটু ভাবা যাক। একদিকে প্রকৃতিকে ভাবা যায় যেন সে নিয়মের দ্বারা চালিত এক যন্ত্র। ভাবা যায় যে, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি এইটেই বের করতে চায় যে, যন্ত্রটা কিভাবে কাজ করে বা এইটে দিয়ে কিভাবে কাজ করানো যায়। প্রকৃতিকে যদি আমরা যন্ত্র হিসেবে ভাবি তাহলে শিক্ষার ভেতর দিয়ে যে জ্ঞানটা দেওয়া হবে তার মূল কথা, এই যন্ত্রটা কিভাবে কাজ করে অথবা এটাকে দিয়ে কিভাবে কাজ করানো যায়। শিক্ষা ব্যাপারটা অবশ্যি আরও বেশি যান্ত্রিক ও বোধশূন্য হতে পারে। শিক্ষক অনেক সময় গতানুগতিক বিদ্যালয়ে অতি বোধহীন পদ্ধতিতে শিক্ষা দান করে থাকেন। কিছু পদ্ধতি, কাজের কতগুলো ধরন যান্ত্রিকভাবে শিখিয়ে দেওয়া হয়, নামতা মুখস্থ করার মতো। অথবা কিছু সংবাদ নিষ্প্রাণভাবে দিয়ে দেওয়া যায়। যেমন পৃথিবীর তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল ইত্যাদি। শিক্ষার ভিতর দিয়ে এই রকম কিছু সংবাদ অথবা প্রাণহীন পদ্ধতির সঙ্গে শিশুর অথবা ছাত্রছাত্রীর পরিচয় ঘটানো যায়। কিন্তু এটা প্রকৃত শিক্ষা নয়। প্রকৃতি শুধু যন্ত্রই নয়। প্রকৃতিকে ভালোবাসা যায়। আমরা যাকে ভালোবাসি কোনো অর্থেই সে যে একটা যন্ত্র নয় এমন নয়। কিন্তু তাকে যদি আমরা শুধু যন্ত্রই ভাবি তবে তাকে আমরা ভালোবাসি না। এমন প্রেমের কথা আমি জানি না যেখানে প্রেমিকা প্রেমিকের চোখে একটি যন্ত্র মাত্র।
কাজেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments