রবীন্দ্রনাথের ভাষা-চিন্তা
ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কৃতির মূল্যায়ন খুব একটা কম হয় নি। পশ্চিমবঙ্গে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার, সুনীল সেনগুপ্ত; বাংলাদেশে মুহম্মদ আবদুল হাই, কাজী দীন মুহম্মদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্; বিদেশে, রাশিয়ায় এ. এম. বিকোভা রবীন্দ্রনাথের ভাষাসংক্রান্ত রচনাবলির অনুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে কবির ভাষাতাত্ত্বিক প্রজ্ঞার গভীরতায় বিমুগ্ধ হয়েছেন। এদেশে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের উদ্গাতা মুহম্মদ আবদুল হাই বলেছেন:
... বিস্ময়ের বিষয় এই যে যাঁকে আমরা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং বাংলাভাষার অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ কবি বলে জানি; সেই কবি রবীন্দ্রনাথই বাংলাভাষার বর্ণনাভিত্তিক আলোচনার জনক এবং পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন (হাই ১৩৬৮: ৬৯)।
ভাষাতাত্ত্বিকেরা রবীন্দ্রনাথের দুটো ভাষাসংক্রান্ত গ্রন্থ ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ ও ‘বাংলা ভাষা পরিচয়’ বিশ্লেষণ করে তাতে বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব, বাংলা রূপতত্ত্ব ও বাংলা শব্দসম্ভারগত যে সব উপকরণ আছে, তাদের শ্রেণিকরণ করার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে ‘ভাষার রাজ্যের রাজা’ হিসেবে অভিষিক্ত করে কাজী দীন মুহম্মদ বলেছেন—“মোদ্দাকথা, আধুনিক ভাষাতত্ত্ব যে অর্থে আধুনিক ও ভাষাতত্ত্ব সে অর্থে রবীন্দ্রনাথের ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা মহাকালের পরীক্ষায় উতরাইয়া যাইবে—তাহাতে সন্দেহ নেই।” ভাষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভাষাবিজ্ঞানীদের এ ধরনের উচ্ছ্বসিত আলোচনার পর ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কোনো অভিনব পরিচয় উদ্ঘাটন রীতিমতো দুঃসাধ্য ব্যাপার। এই প্রবন্ধে আমরা সেরকম চেষ্টা করবো না।
ইংরেজি শেখার মানসিক চাপ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের রসময় কিন্তু তীব্র পর্যবেক্ষণ—"ইংরেজের ছাব্বিশটা অক্ষর ফার্স্টবুকে থেকে ছেলেদের পাকযন্ত্র আক্রমণ করে"। আবার খাঁটি বাংলার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও ভাবপ্রকাশের সমৃদ্ধির জন্য সংস্কৃতের আশ্রয় নেওয়াকে তিনি অপরিহার্য বলেছেন।
রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ভাষা নিয়ে কাজ-কারবার করেছেন। বাংলা ভাষার বিভিন্ন মূর্তি তিনি অবলোকন করেছেন, এ ভাষার বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম তিনি অনুভব করেছেন, এ ভাষার শক্তি-সামর্থ্য তিনি পরিমাপ করেছেন। বাংলা ছাড়া ইংরেজি ভাষায় তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন। বাংলা তাঁর প্রথম ভাষা, ইংরেজি তাঁর দ্বিতীয় ভাষা। এই দু ভাষায় নিজেকে অভিব্যক্ত করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার চরিত্র যেমন বুঝতে চেষ্টা করেছেন, তেমনি ইংরেজি ভাষার চরিত্রও তিনি অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন। সংস্কৃত ভাষায়ও রবীন্দ্রনাথের প্রবেশাধিকার ছিল। আরো কোনো কোনো বিদেশি ভাষায় তাঁর কিছু-না-কিছু যোগ্যতা ছিল। ফলে মানুষের ভাষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অনুধ্যান এবং বাংলা ভাষা ও ইংরেজি ভাষা সম্বন্ধে তাঁর মতামত তাঁর সামগ্রিক ভাষাচিন্তাকে প্রকটিত করতে পারে। সেজন্য রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তার পরিসীমা উপলব্ধির প্রয়োজনে তাঁর আশি বছরের জীবনের ভাষাগত বিকাশের খতিয়ান নেওয়া প্রয়োজন বিবেচনা করছি।
সব মানব শিশু যেমন শিখে থাকে, রবীন্দ্রনাথও জীবনের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যেই ‘ঠাকুর বাড়ীর বাংলা ভাষা’ যথারীতি শিখে নিয়েছেন। ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ এই ছন্দমিলের অনির্বচনীয়তা যখন তাঁর চেতনায় ধরা পড়ে তখন তাঁর বয়স কত জানি না, তবে বাংলা ভাষার মিলের পুলক তিনি এর মধ্যেই অনুভব করেছিলেন। রবীন্দ্র-জীবনে ভাষার অনুশীলনের ইতিহাস যাঁরা অনুসন্ধান করেছেন, তাঁরা বলেছেন প্রায় পঁচাত্তর বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই পঁচাত্তর বছর ধরে তিনি তাঁর চার পাশের বস্তুজগতের রহস্যও অনুভব-উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে, মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে রবীন্দ্রনাথ দুটো পুস্তিকা লিখেছেন, দুটোই শ’খানেক পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দুটো বই-ই পরিচয়মূলক, একটি বইয়ের নাম ‘বাংলাভাষা পরিচয়’ (১৯৩৮) অপর বইটির নাম ‘বিশ্বপরিচয়’ (১৩৪৪)। একটিতে তিনি বাংলা ভাষার স্বরূপ-পরিচয় উদ্ঘাটন করেছেন, অপরটিতে তিনি বস্তু-বিশ্বের পরিচয় দিয়েছেন। এই দুটো গ্রন্থেই তাঁর অধ্যয়ন, তাঁর উপলব্ধি এবং এ দুয়ের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা তাঁর মতামত জানতে পারা যায়। দুটো গ্রন্থেই কোনো পাদটীকা নেই, ফলে তাঁর চিন্তাসূত্রের উৎস ও তার সংশ্লেষণের প্রক্রিয়া আবিষ্কার করা সহজসাধ্য হয় না।
‘বিশ্বপরিচয়’ ও ‘বাংলাভাষা পরিচয়’ এ দুটো বই সম্বন্ধে উল্লেখের একটু কারণ আছে। বিশ্ব ও ভাষার মধ্যে এক ধরনের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য আছে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments