রবীন্দ্রনাথ
বৈশাখ মাস এলেই অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের রুদ্র রূপ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক রুদ্র রূপের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৈশাখ আসে মানুষের জীবনের সমস্ত জীর্ণতাকে উড়িয়ে নিতে। জীর্ণতা, অসদ্ভাব, অকল্যাণ এবং যে নির্যাতন মানুষের জীবনের মধ্যে প্রত্যহ গড়ে উঠেছে, সে নির্যাতন এবং অসদ্ভাবের বিরুদ্ধেই বৈশাখ তার কল্লোলিত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। সে কারণেই তিনি বলেছেন, যে রুদ্র বৈশাখ এখন এলো তার সঙ্গে আমি যদি সামঞ্জস্য বিধান নাও করতে পারি তাহলে আমাকে পথের এক প্রান্তে রেখে দাও, দাঁড়িয়ে আমি সমস্ত পৃথিবীর মানুষের চলাচল দেখবো, সমস্ত মানুষ যে পথে অনবরত অগ্রসর হচ্ছে, দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। অসদ্ভাবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, অকল্যাণের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, জীর্ণতার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সেই যে মানুষ অনবরত অগ্রসর হচ্ছে সব কিছুকে অতিক্রম করে সেই মানুষের যাত্রা আমি দেখতে চাই। এই আর্তি রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছিলেন। তার ফলে, আমাদের মনের মধ্যে এই আশ্বাস বাণী সব সময় গুঞ্জরিত হয় যে জীবনকে অবহেলা করলেও জীবনের মূল্য কখনো নষ্ট হয়ে যায় না—যতদিন আমরা পৃথিবীতে আছি, ততদিন পৃথিবীর সমস্ত মুহূর্তের সঙ্গে আমাদের আলগ্ন থাকতে হবে এবং মুহূর্তের সঙ্গে আলগ্ন থেকে মুহূর্তের সমস্ত অকল্যাণকে অতিক্রম করতে হবে। জীবনে দ্বন্দ্ব আছে, জীবনে অসদ্ভাব আছে, জীবনে অকল্যাণ আছে, জীর্ণতা এবং মালিন্য আছে। এই সমস্ত অতিক্রম করার লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিটি মানুষের। রবীন্দ্রনাথ তার সারাজীবন ব্যাপী এই অতিক্রমের কথা বলেছিলেন।
আমরা জানি প্রত্যেক দেশে মহৎ কবির আবির্ভাব যখন ঘটে, তখন তিনি দেশের ভাষাকে রূপ দেন। তাঁর সময় পর্যন্ত সে ভাষায় যে রূপ, যে অভিব্যক্তি থাকে, সেই অভিব্যক্তিকে আরও বিচিত্র করেন। ইংল্যন্ডে শেক্সপীয়র করেছিলেন, ইটালিতে দান্তে করেছিলেন, জার্মানিতে গ্যয়টে করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সেই কর্তব্য সাধন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি উপন্যাসের সূত্রপাতে বলেছিলেন প্রতিটি আরম্ভের আগেও একটি আরম্ভ আছে। যেমন একটা প্রদীপ যখন জ্বলে তার সলতে পিছন থেকে এগিয়ে দিতে হয়। সুতরাং শুধু এই মুহূর্ত নিয়ে থাকলে চলবে না। পশ্চাতের যে ইতিহাস আছে, সে ইতিহাস আমাদের গ্রহণ করতে হবে এবং তার মধ্যে দিয়ে সত্যকে উদ্ঘাটন করতে হবে। এই ইতিহাস উদ্ঘাটন করতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন প্রাচীন ভারতবর্ষ, ভারতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্য, বেদ এবং উপনিষদের ঐতিহ্য, কালিদাসের ঐতিহ্যকে। সে ঐতিহ্যকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন। যে সময়ে তাঁর আবির্ভাব—ঊনবিংশ শতাব্দীতে—তখন বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভাধর কয়েকজন মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছিল। আমরা রাজা রামমোহনকে দেখেছি, আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে দেখেছি, আমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে দেখেছি, আমরা মাইকেল মধুসূদনকে দেখেছি। তাঁরা প্রত্যেকেই বাংলা ভাষা এবং বাঙালির সমাজ জীবন ও বাঙালি সংস্কৃতিকে সম্মুখবর্তী করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় যুক্তির প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছিলেন আমাদের জীবনে, যে জীবন আবেগে উচ্ছল ছিল, যে জীবন আবেগে ভরপুর, সে জীবনকে যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে আবিষ্কার করার জন্য উন্মুখ করলেন। যদি মানুষ সত্যকে আবিষ্কার করতে চায়, তাহলে আবেগের সাহায্যে কিন্তু সত্যকে উদ্ঘাটন করা যায় না। যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে উদ্ঘাটন করা সম্ভবপর। রাজা রামমোহন রায় সেই যুক্তিবাদের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছিলেন আমাদের জীবনে। তেমনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। সমস্ত অন্ধবিশ্বাসের মূলে আঘাত করেছিলেন। তিনিও যুক্তিবাদী, তিনি যুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষাকে তার সুপ্ত অবস্থা থেকে জাগ্রত চৈতন্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছিলেন তিনি এমন কাব্য রচনা করবেন ‘গৌড় জন যাহে... আনন্দে করিবে পান।’
বিদেশে অবস্থান কালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বঙ্গ ভাষার মাধুর্যে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন।
মাতৃভাষার কাছে তিনি প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন ‘মাতৃভাষারূপ খনি পূর্ণ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments