রবীন্দ্রনাথের ব্যাকরণ-ভাবনা
এক
রবীন্দ্রনাথ কবি, তবে তিনি আর দশজন কবির মতো কেবল কতিপয় দ্যুতিময় কবিতার নির্মাতা ছিলেন না। অর্থাৎ তাঁর কবিত্ব সীমাবদ্ধ থাকে নি কেবল কাব্য-নির্মাণ কলায়; নাট্য-সৃজন সংবেদনায়, গল্প-উপন্যাসের শিল্পিত রূপায়ণে, প্রবন্ধ রচনার প্রগাঢ় প্রজ্ঞায় কিংবা সঙ্গীত—গীতিনাট্যের সাংকেতিক সুর-মূর্ছনায়। তাঁর এ কবি-শক্তি সর্বানুভূমিতে যেমন দীপ্র, সর্বত্রচারিতায় তেমনি ঈর্ষণীয় ক্ষিপ্র। ‘ভূমা’র প্রবল আকর্ষণে তিনি আগ্রহী হয়েছিলেন ‘বিশ্ব পরিচয়ে’, সীমাবদ্ধকালের খণ্ডিত মানুষ তাই তাঁর অন্বিষ্ট ছিল না কদাচ, জীবনের খণ্ডাংশকে প্রতিফলিত করা তাঁর কবি-স্বভাব বিরোধী ছিল তাঁর আজন্ম সাধনায় তিনি সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করেছেন সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তায় সমুজ্জ্বল মানুষের সার্বিক জীবনকে। এবং তাঁর কবি-প্রত্যয়ের কেন্দ্রীয় মানব-সত্তাকে চিত্রিত করতে গিয়ে অনিবার্যভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, মানুষের সমাজ-সভ্যতা, স্বদেশ-স্বকাল, ধর্ম-দর্শন, রাজনীতি-ইতিহাস, সংগ্রাম-সঙ্কট, আশা-হতাশা, ভাষা-সংস্কৃতি ইত্যাকার বিষয়সমূহ। তাঁর প্রলম্বিত জীবনকাল একদিকে যেমন তাঁকে প্রসারিত বিশ্বের নাগরিকত্ব দিয়েছিল, তেমনি অতুল মানবিক সংবেদনা ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ করেছিল তাঁর অম্লান শিল্পাঞ্চলকে। তাঁর সার্বভৌম জীবনবাদী কবি-শক্তি যেহেতু ছিল সর্বরসসিদ্ধ এবং সর্বগ, সেজন্যেই আমরা ব্যক্তিক কিংবা জাতীয় জীবনের সঙ্কটময় মুহূর্তে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করি, নয়ন ভরে দেখি এমন একজন রবীন্দ্রনাথকে, যিনি স্বদেশের, স্বকালের, স্বভাষার এবং জাতীয় জীবনের প্রতারক প্রত্যাশার শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় আমাদের জাড্য-চেতনার অষ্টাবক্র অন্ধকার দূর করতে পারেন, স্থবির বন্ধ্যাত্বের পরিবর্তে সম্ভাবনাময় জীবন—জাগাতে সক্ষম, নিখিল-নাস্তির ত্রিশঙ্কু সময়ে ধ্রুব-অস্তির সমাচার প্রদানে ক্ষান্তিহীন, মানুষের প্রতি প্রগাঢ়-প্রতীতিতে প্রোজ্জ্বল করতে পারঙ্গম, বিপন্ন-অস্তিত্বের অনিকেত-যন্ত্রণা অতিক্রম করে বেঁচে থাকার অর্থ শোনাতে যিনি বিকল্পবিহীন এবং যিনি জগৎ ও জীবনের সার্থকতার মন্ত্র উচ্চারণে চিরদিন এক অক্লান্ত কথক। ফলে, শতাব্দের ব্যবধানেও রবীন্দ্র-জিজ্ঞাসা মূলত আমাদের আত্ম-অন্বেষার নামান্তর।
মানবিক-সত্তার নিগূঢ় সমাচার সরবরাহে তাঁর কাব্য-নাটক যেমন বিচিত্র সম্ভারে সমুজ্জ্বল, অন্তর্লীন চৈতন্যের সঙ্কট-উন্মোচনে গল্প-উপন্যাস যেমন অনুপম আশ্রয়, আত্মার বন্ধন—মুক্তির সুর-মূর্ছনায় সঙ্গীত যেমন অবিস্মরণীয় সরণি, তেমনি মাতৃভাষা বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র—স্বাধীন বিকাশ ও বিস্তারে, দ্যুতি ও গতিতে তাঁর ভাষাবিষয়ক রচনাও এক প্রাণবান নির্ঝরণী।
“বৈয়াকরণের যে-সকল গুণ ও বিদ্যা থাকা উচিত তাহা আমার নাই, শিশুকাল হইতে স্বভাবতই আমি ব্যাকরণভীরু; কিন্তু বাংলা ভাষাকে তাহার সকল প্রকার মূর্তিতেই আমি হৃদয়ের সহিত শ্রদ্ধা করি...”
সুতরাং প্রচলিত পথে নয়, এবারে আমরা রবীন্দ্রনাথকে দেখতে চেষ্টা করবো কিছুটা ভিন্নতর পরিপ্রেক্ষিতে, স্বতন্ত্র-সরণিতে। আমরা অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করবো ‘রসতীর্থের পথিক' এই কবি কোন প্রবল রসের অমোঘ আকর্ষণে কর্ষণ করেছিলেন মাতৃভাষার অনেক অনাবাদী এলাকা। ফলে, এবারে আমরা অতি সংক্ষিপ্তভাবে রবীন্দ্রনাথের ভাষা-জিজ্ঞাসার স্বরূপ উপলব্ধিতে যত্নবান হবো এবং প্রসঙ্গক্রমে তাঁর ব্যাকরণ-ভাবনার আংশিক পরিচয় তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।
দুই
বঙ্গাব্দ ১৩১১, রবীন্দ্রনাথের বয়স তেতাল্লিশ, রোমান্টিক কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি সর্বজন-বিদিত, তখন ‘ভারতী’ আষাঢ়-শ্রাবণ সংখ্যায় ‘ভাষার ইঙ্গিত’ প্রবন্ধে তিনি ব্যক্ত করেছিলেন: “বৈয়াকরণের যে-সকল গুণ ও বিদ্যা থাকা উচিত তাহা আমার নাই, শিশুকাল হইতে স্বভাবতই আমি ব্যাকরণভীরু; কিন্তু বাংলা ভাষাকে তাহার সকল প্রকার মূর্তিতেই আমি হৃদয়ের সহিত শ্রদ্ধা করি, এইজন্য তাহার সহিত তন্ন তন্ন করিয়া পরিচয় সাধনে আমি ক্লান্তি বোধ করি না। এই চেষ্টার ফল স্বরূপে ভাষার ভাণ্ডার হইতে যাহা-কিছু আহরণ করিয়া থাকি, মাঝে মাঝে তাহার এটা ওটা সকলকে দেখাইবার জন্য আনিয়া উপস্থিত করি; ইহাতে ব্যাকরণকে চিরঋণে বদ্ধ করিতেছি বলিয়া স্পর্ধা করিব না, ভুলচুক অসম্পূর্ণতাও যথেষ্ট থাকিবে। কিন্তু আমার এই চেষ্টায় কাহারো মনে যদি এরূপ ধারণা হয় যে, প্রাকৃত বাংলা ভাষার নিজের একটি স্বতন্ত্র আকার প্রকার আছে এবং এই আকৃতি প্রকৃতির তত্ত্ব নির্ণয় করিয়া শ্রদ্ধার সহিত অধ্যবসায়ের সহিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনায় যদি যোগ্য লোকের উৎসাহ বোধ হয়, তাহা হইলে আমার এই বিস্মরণযোগ্য ক্ষণস্থায়ী চেষ্টা সকল সার্থক হইবে।”[১]
রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বভাব-বিনয়-বশত যাকে ‘বিস্মরণযোগ্য
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments