‘সাম্প্রদায়িকতা ও রবীন্দ্রবিরোধিতা’
বহু শতাব্দী থেকে এ দেশের পল্লীতে হিন্দু ও মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেছে। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে তো বটেই, এমন কি, ধর্মীয় চেতনায়ও তারা সমন্বয় সাধন করেছেন। বৈষ্ণব দর্শনের পশ্চাতে সূফী প্রভাব ঠিক কতখানি আজো তা গবেষণার বিষয়। কিন্তু পণ্ডিতগণ অনুমান করেন, সে প্রভাব যথেষ্ট গভীর। তা ছাড়া বৈষ্ণবদের সাম্যবাদী আদর্শও ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রীর দ্বারা প্রভাবিত। সহজিয়াদের সাধনার অথবা কবীরের ধর্মেও ইসলামের মানবিক আদর্শ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কবীরের সদগুরু ও সত্যপীর এক কিনা অথবা সত্যপীরের কল্পনায় কবীরের সমন্বয়ধর্মী মনোভাব কাজ করেছে কিনা জানিনে; কিন্তু সত্যপীর হিন্দু-মুসলমানের যুগল আদর্শের সংশ্লেষিতরূপ। হিন্দু ও মুসলমানের এই ভাবের সমন্বয় অত্যুজ্জ্বলভাবে বিধৃত আছে এ দেশের সাহিত্য, সঙ্গীত, জ্যোতিষ ও ইতিহাসে। বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল গান, সত্যপীরের পাঁচালি, ময়মনসিংহ গীতিকা এবং বিপুল পল্লী সাহিত্য ও সঙ্গীতে হিন্দু-মুসলমানের সমন্বয়ী ভাবাদর্শ অকৃত্রিমরূপে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই জন্যেই, শুধু ধর্মীয় কারণে হিন্দু ও মুসলমান দরিদ্র জনগণের মধ্যে বিরোধ বেধেছে, ইতিহাস সেরূপ সাক্ষ্য দেয় না। সমাজ-অর্থনৈতিক কারণে উদ্ভূত উচ্চ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের অন্তর্দ্বন্দ্বের মতো, উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সকল মানুষের মধ্যে একটা শ্রেণীসংগ্রাম চিরকালই চলে এসেছে। ইংরেজদের আগমনের পর বহু সাধারণ হিন্দু ব্যবসাবাণিজ্য করে অথবা ইংরেজি শিখে রাতারাতি মধ্যবিত্তে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু উচ্চবিত্তের নাগরিক মুসলমানগণ ইংরেজদের ওপর গোঁসা করে এবং বিত্তহীন গ্রামের মুসলমানরা সুযোগের অভাবে, আপনাদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারেন নি। এর ফলে, অল্প দিনের মধ্যেই হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখা দেয়, তার প্রত্যক্ষ ফল ঊনবিংশ শতাব্দীর সুস্পষ্ট সাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ। হিন্দু-মুসলিম বৈরীর মূল কারণ রবীন্দ্রনাথ কবি হয়েও বুঝতে পেরেছিলেন। ১৯২২ সালে তিনি বলেছিলেন, একমাত্র অর্থনৈতিক সাম্যের ভিত্তিতেই এই উভয় সম্প্রদায়ের মৈত্রী স্থায়ী হতে পারে। দেশবিভাগের পরে আকস্মিক প্রতিযোগিতার অভাব ঘটাতে এবং সুযোগ বৃদ্ধির ফলে পূর্ব বাংলায় স্বল্পকালের মধ্যে একটি বৃহৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে। এরাই অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির লালন করেছেন। ১৯৪৮ সালে যে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত তা-ই ১৯৫২ সালে এ শ্রেণীর ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতায় সার্বজনিক রূপ নেয়।
"বাংলা দেশ এভাবে এগিয়ে চলে অসাম্প্রদায়িক মুক্তবুদ্ধির পথে। এরই ফলশ্রুতিস্বরূপ সেখানকার জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচিত হতে পারলো রবীন্দ্রনাথের একটি গান, যে গানে দেশকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।"
ফেব্রুআরি আন্দোলনের তীব্রতার মুখে পাকিস্তানের চরম অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সরকারকেও আতঙ্কিত হয়ে বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিতে হয়। আন্দোলনের তীব্রতা এ আতঙ্কের কারণ নয়, আতঙ্ক ভাবী বাংলা সংস্কৃতিকে। সেহেতু সরকার নতুন পরিকল্পনা নিলেন বাংলা সংস্কৃতিকে খর্ব করার। ১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী বাংলার সকল ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এক সবুজ বিপ্লব আনয়নের আহ্বান জানালেন তাঁরা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত সকল হিন্দু নামকে তাঁরা মুছে ফেলতে উদ্যোগী হলেন। বঙ্কিমের বদলে মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথের বদলে নজরুলকে এঁরা দাড় করালেন। প্রকৃতপক্ষে, বাংলা সংস্কৃতি-বিরোধিতার প্রতীক হলো রবীন্দ্র-বিরোধিতা। সরকারের সাংস্কৃতিক দালালারা চাইলেন রবীন্দ্রনাথকে নানা উপায়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্র থেকে মুছে ফেলতে। আর বিপুল সংখ্যক সংস্কৃতিসেবীরা চাইলেন তাঁর আপন মহিমায় রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠিত করতে। এই টানাপোড়েন প্রবলভাবে শুরু হয় ১৯৬১ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকীকে উপলক্ষ করে। আজাদ পত্রিকার সম্পাদক একান্ত প্রতিক্রিয়াশীল মওলানা আক্ৰাম খাঁ ও সরকারের অন্যান্য দালালরা এ সময়ে বলতে শুরু করেন যে, রবীন্দ্রনাথ মুসলমান নন, রবীন্দ্রনাথ পাকিস্তানি নন, রবীন্দ্রনাথ মুসলিম সমাজ নিয়ে লেখেননি এবং রবীন্দ্রনাথ মুসলিমদের বিরুদ্ধে লিখেছেন : সুতরাং পাকিস্তানের পাকমাটিতে তিনি পরিত্যাজ্য। ধর্মের গোঁড়ামি এদের দৃষ্টিকে এমন আবিল করেছিলো এবং এঁদের মন আরব মরুভূমির খেজুরতলার দিকে এমন নিবিষ্ট ছিলো যে, সাম্রাজ্যলোলুপ বিদেশী মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশীয় কোনো শিবাজী
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments