-
বাংলার প্রাচীন রাজধানী যদিও মুনিম খান খান খানানের সময়ে এমনভাবে বিরান হয় যে হুমায়ুনের শখের এই জান্নাতাবাদ' একেবারেই ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয় এবং পরে আর কখনই এ স্থান জনবসতির মুখ দেখে নাই। সোনারগাঁ' কিছু দিনের জন্য পূর্ব বাংলার রাজধানী ছিল কিন্তু আজ সেটিও একটি গ্রাম বা মামুলি ছোট শহরের (কসবা) বেশি নয়। পাঠান শাসনামলে তাণ্ডা, ফতেহাবাদ, সাতগাঁ ইত্যাদি স্থানে রাজধানী, টাকশাল স্থাপিত হতে থাকে কিন্তু আজ এগুলির নাম নিশানা নেই বরং কিছু কিছু স্থানের অবস্থান নির্ধারণ করাও যায় না। কিন্তু ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য যে প্রত্যেক আমলে ও যুগে ঢাকা জাঁকজমক ও আড়ম্বরপূর্ণ এবং স্বপরিচয়ে টিকে ছিল। অবশেষে মুর্শিদকুলী খান
-
সমাজ এবং সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেক যুগে পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে। আমি আমার বাল্যকালে যে সব পেশার লোকদের দেখেছি, বর্তমানে হয় সে পেশার কোনো অস্তিত্বই নেই অথবা যদি থেকে থাকে তবে জীবস্মৃত অবস্থায় রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিজ অভ্যন্তরে একটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যদি এটি কোনোভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। আজকের আসরে সংক্ষিপ্তভাবে আমি কিছু শিল্পীদের উল্লেখ করব। আজ থেকে ত্রিশ বছর পূর্ব পর্যন্ত ঢাকায় 'বাদলাকশ' ছিল। এরা ছিল তাঁতিবাজারের বসাক। এরাই সোনালি তারের পাড়ের আবরণী (গোটা পটহা) তৈরি করত। সুস্পষ্টত এই পেশা মুসলমানদের সঙ্গে অন্য স্থান থেকে এসেছিল এবং মুসলমানদের পতনের
-
সেদিন বুড়ীগঙ্গার তীরবর্তী আমাদের এই বাকল্যাণ্ড বাঁধের কথা বলছিলাম আহমদউল্লাহ সাহেবের সাথে। বলছিলাম—কি ছিল আর কি হয়ে গেল! কি দেখেছিলাম সে সময় আর কি দেখছি আজ! দশ বছর আগে যে লোক ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে যদি আজ ফিরে আসে, তাহলে বাকল্যান্ড বাঁধের শ্রী দেখে সে তাজ্জব বনে যাবে। আর যদি আমার মতো নেশাখোর ভ্রমণার্থীদের কেউ হয়, তাহলে মর্মান্তিক আঘাত পাবে। কতোদিনের কতো স্মৃতি এই নদী আর এই নদীতীরের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে! এখন তাই একান্ত বাধ্য হয়ে না পড়লে ও পথে পা বাড়াই না। কেনো এমন হলো? এই বাকল্যান্ড বাঁধের পিছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা অনেকেরই হয়তো
-
বাঙলাদেশ জ্বলছে। জ্বলছে ঢাকা শহর, এখনকার বাঙলাদেশের রাজধানী শুধু জ্বলেনি, অনেক পরিমাণে নিশ্চিহ্ন। যেমন বাঙলাদেশের আর সব গ্রামে ও শহরে তেমনি পূর্ববঙ্গের এই ইতিহাস প্রসিদ্ধ সংস্কৃতিকেন্দ্র ঢাকায়ও হানা দিয়েছে মনুষ্যত্বহীন বিবেকবুদ্ধি বর্জিত মারণাস্ত্রে সুসজ্জিত রক্তচক্ষু শাসকের নরখাদক বাহিনী। ঢাকা এখন ধ্বংসস্তূপ, লড়াই চলেছে এখানে-সেখানে। নির্জন পথঘাটে শ্মশানের স্তব্ধতা।
এই ঢাকা শহরেই জন্মেছিলাম, কাটিয়েছি শৈশব থেকে যৌবনের বেশ কিছু সময় পর্যন্ত। কখনো ভাবিনি ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হবে। খাওয়া-দাওয়া শস্তা, লেখা-পড়ার সুযোগ পর্যাপ্ত, বারো মাসে তেরো পার্বনের ঢেউ। ঢাকা শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র, রাজনীতির প্রাণকেন্দ্রও নিশ্চয়। ছেলেবেলা থেকেই দেখেছি ঢাকায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ ছেলেদের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের উদ্বোধন, শরীরচর্চা খেলাধুলোর মধ্য
-
'গানবাজনায় ঢাকার নাম ছিল। অনেক ধ্রুপদী গায়ক ছিলেন। ভগবান সেতারীর বাজনা ছিল অপূর্ব, কেশব বন্দ্যোপাধ্যায়ের তবলা-বাদনের খ্যাতি ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। মধ্যবিত্ত সমাজে দুটি ছোট মেয়ের খুব নাম—একজন রানু সোম, প্রতিভা বসু নামে যাঁর সাহিত্যিক খ্যাতি, এবং অন্যজন রেণুকা সেনগুপ্ত—যাঁর “যদি গোকুলচন্দ্র ব্রজে না এলে” গানটির রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল রেকর্ড ভেঙে। অন্য গায়ক ও সংগীতজ্ঞ আসতেন বাইরে থেকে। একবার এলেন দিলীপ রায় এবং মাতিয়ে দিয়ে গেলেন। আর একবার এলেন আলাউদ্দীন খাঁ, যিনি সৃষ্টি করলেন ইন্দ্রজাল। নজরুল ইসলাম এসেছিলেন— যেখানে ডাকা হয় সেখানেই আবৃত্তি করতেন। “বিদ্রোহী" আর গেয়ে শোনালেন “দুর্গম গিরি কান্তার মরু”। (আট দশক—ভবতোষ দত্ত। পৃ. ৫৪ )
ঢাকা যখন
-
যে ধর্ম স্বয়ং ভগবানের উপদিষ্ট; যাহা পরম যোগীগণের শত সহস্র বর্ষব্যাপী কঠোর তপস্যার ফল; যাহার জন্য সাম্রাজ্যাধিপতিগণও অনায়াসে বিষয় ভোগ তুচ্ছ করিয়া গভীর অরণ্যে প্রবেশপূর্বক গলিত পত্রাদি ভক্ষণ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা শ্রেয়োবোধ করিতেন; যে সারবান্ ধর্মকে বিনাশ জন্য কত শত দৈত্য রাক্ষস সমুদ্যত হইয়াও কিছু করিতে পারে নাই; যাহা অনন্তকাল হইলে অনন্ত লোকের সদগতির একমাত্র নিদান স্বরূপে বিরাজমান, সর্বজ্ঞ মহর্ষিদিগের ভষ্যিবাদিতা সাফল্য করিবার জন্যই যেন এই কলিকালে সেই ধর্মে লোক সমূহ আস্থাহীন হইয়া নানা অসৎপথে বিচরণ করিতেছে। মহাকাল পুরুষ মহাপ্রলয়ের হেতুভূত পাপরাশি সঞ্চিত করিবার জন্য জীবসমূহকে নিয়তই পাপের দিকে নানা প্রলোভন দ্বারা টানিতেছে, তাহারই কৌশলে সামান্য বুদ্ধি আধুনিক মানবের
-
ড. আবদুল করিম মোঘল আমলে ঢাকার বাণিজ্য প্রসার লিখেছেন: “নদীপথে চারিদিকের সকল অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত একটি কেন্দ্র হিসাবে ঢাকার অবস্থান সমগ্র দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। এই শহরের প্রসার এবং এর ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি শহরে জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন দ্রব্য সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক এলাকা ও হাটবাজারের উন্নয়ন অপরিহার্য করে তোলে। যেকোন শহরের প্রসারের কারণে শহরে কারিগর, পণ্য প্রস্তুতকারক, শিল্পী ও বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণীর বসতি স্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে যাতে তারা এখানে অবস্থা করে কাঁচামাল ক্রয় এবং তৈরি মালামাল বিক্রয় করতে পারে। ঢাকা মোগল প্রদেশ বাংলার রাজধানী এবং সামরিক ও বেসামরিক সদর দফতরে পরিণত হয়। বণিক ব্যবসায়ীগণ সরকার থেকে পরোয়ানা
-
“সেই আমি প্রথম দেখলাম নজরুলকে, অন্য অনেক অসংখ্যের মতোই দেখামাত্র প্রেমে পড়ে গেলাম। চওড়া কাঁধে বলিষ্ঠ তাঁর দেহ, মাঝখান দিয়ে সোজা-সিঁথি-করা কোঁকড়া চুল গ্রীবা ছাপিয়ে প্লাবিত, মুখখানা বড়ো ও গোল ছাঁদের, নেত্র আয়ত ও কোণ রক্তিম। গায়ে গেরুয়া রঙের খদ্দর পাঞ্জাবি, কাঁধে সূর্যমূখী হলুদ চাদর। কণ্ঠে তাঁর হাসি, কণ্ঠে তাঁর গান, প্রাণে তাঁর অফুরান আনন্দ—সব মিলিয়ে মনোলুন্ঠনকারী একটি মানুষ। তাঁর জন্য আমি জগন্নাথ হল-এ যে-সভাটি আহ্বান করেছিলাম তাতে ভিড় জমে ছিল প্রচুর। দূর শহর থেকে ইডেন কলেজের অধ্যাপিকারাও এসেছিলেন, তাঁর গান ও কবিতা আবৃত্তি শুনে সকলেই মুগ্ধ: মৃত অথবা বৃদ্ধ অথবা প্রতিষ্ঠানীভূত না-হওয়া পর্যন্ত কবিদের বিষয়ে, যাঁরা স্বাস্থ্যকরভাবে সন্দিগ্ধ, সেই
-
বাংলার প্রথম মোগল গভর্নর ইসলাম খান', যাঁকে ঢাকার পুনরুজ্জীবিত আবাদীর প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়, তিনি এখানে মাত্র ৫ বৎসর ৩ সপ্তাহ ১৯ দিন বসবাস করেন এবং তাঁর পুরা শাসনকাল অধিকাংশই যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যবস্থাপনায় অতিবাহিত হয়েছে। মিস্টার শার্লীমেন তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ইসলাম খানের দরবারে বার শত 'কাঞ্চনী", নর্তকী চাকরিরত ছিল, যাদের পেশা ছিল নাচ-গান। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম খানের ঢাকায় আগমনের পূর্বেই ঢাকা যথেষ্টভাবে জন অধ্যুষিত ছিল এবং এখানে গান বাজনার প্রচুর চর্চা ছিল, অন্যথায় হঠাৎ করেই অথবা এত কম সময়ের মধ্যে বার শত কাঞ্চনী কোথা থেকে আগমন করবে? ইবনে বতুতার কাছ থেকেও এর সত্যতা
-
শুভ স্মরণ। ঢাকা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে কেমন ছিল? এখানকার জনসাধারণের সমাজ কি ছিল, সভ্যতা সংস্কৃতির অবস্থা কী রূপ ছিল, শিক্ষা-দীক্ষার স্বরূপই বা কেমন ছিল? কোন্ কোন্ বিদ্যা ও শিল্পকলার অনুশীলন হতো? কী ধরনের বসবাস ছিল? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকেরা কি করত? বিয়ে-শাদীতে কী কী আনুষ্ঠানিকতার প্রচলন ছিল? দুঃখ-শোক কিভাবে পালন করা হতো? মেলা-পার্বণে কি হতো? নিমন্ত্রণে কী ধরনের বাড়াবাড়ি ছিল? এখানকার প্রতিভাবান এবং শৌখিন অধিবাসীরা পোশাক পরিচ্ছদে কী কী কাটছাট সৃষ্টি করেছিল? ঢাকা নিজস্ব কোন্ শিল্পজাত দ্রব্যের জন্য সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত ছিল? অর্থাৎ সেই ঢাকা যা হিন্দুস্থানে প্রাচ্য তাহজীব তমদ্দুনের সর্বশেষ লালন ক্ষেত্র ছিল এবং এক পর্যায়
-
প্রথম আলোচনাতেই যেমন আমি বলেছি যে, ঢাকার বর্তমান মুসলিম বাসিন্দাদের সংস্কৃতিবান অংশ মোগল যুগের স্মৃতিবাহী। আজ তার উপর এতটুকু সংযোজন করছি যে, এখানে মোগল যুগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্মেনীয়দের বসবাস ছিল এবং সকলেই ধনী সওদাগর ছিলেন। শেষের দিকে তারা বড় বড় জমিদারী কিনে নিয়েছিলেন। এজন্য ঢাকার খাবার দাবারে আরমেনীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। অর্থাৎ এখানে কিছু প্রাচীনতম খাবার রয়েছে, কিছু ইরানি খাবার, কিছু আরমেনীয় খাবার আছে এবং কিছু ঢাকার সুন্দর রুচির উদ্ভাবন।
মিস্টার পিটার-এর ভাষায় পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদের রুচি হচ্ছে মিশ্রিত কাবাব এবং পোলাও। পোলাও দু'ভাবে রান্না হয়। সহজ পদ্ধতি হচ্ছে 'পাশানো', প্রথম চাউল সিদ্ধ করে নেয়া হয়,
-
এটা বাস্তব যে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে এখানকার বাসিন্দারা আজকের মতোই খালি মাথায় থাকত। মুসলমানগণ যখন এখানে আগমন করেন তখন তারা পাগড়ি বেঁধে আসেন এবং আজও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেননা এখানে যারা পশ্চিম থেকে আসেন, তারা পাগড়ি পরিধান করেই আসেন। অর্থ এই যে, ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান সবই পাগড়ি পরিহিত দেশ এবং আগমনকারীরা ঐ দিক থেকেই এসে থাকেন। অতঃপর ইসলাম ধর্মে পাগড়ির সম্মান রক্ষিত হয়েছে এবং ইমামতির জন্য পাগড়ি আবশ্যক করা হয়েছে।' এখানে (ঢাকাতে) দরবেশদের বংশ ছিল এবং তাঁরাও সর্বদা পাগড়ি ব্যবহার করতেন। সুতরাং ঢাকার বিখ্যাত খানকাসমূহ, মগবাজার এবং আজিমপুরের বুজর্গদের যে সব ছবি দেখা গেছে সবাইকেই এক বিশেষ ধরনের পাগড়ি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.