-
শুভ স্মরণ। ঢাকা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে কেমন ছিল? এখানকার জনসাধারণের সমাজ কি ছিল, সভ্যতা সংস্কৃতির অবস্থা কী রূপ ছিল, শিক্ষা-দীক্ষার স্বরূপই বা কেমন ছিল? কোন্ কোন্ বিদ্যা ও শিল্পকলার অনুশীলন হতো? কী ধরনের বসবাস ছিল? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকেরা কি করত? বিয়ে-শাদীতে কী কী আনুষ্ঠানিকতার প্রচলন ছিল? দুঃখ-শোক কিভাবে পালন করা হতো? মেলা-পার্বণে কি হতো? নিমন্ত্রণে কী ধরনের বাড়াবাড়ি ছিল? এখানকার প্রতিভাবান এবং শৌখিন অধিবাসীরা পোশাক পরিচ্ছদে কী কী কাটছাট সৃষ্টি করেছিল? ঢাকা নিজস্ব কোন্ শিল্পজাত দ্রব্যের জন্য সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত ছিল? অর্থাৎ সেই ঢাকা যা হিন্দুস্থানে প্রাচ্য তাহজীব তমদ্দুনের সর্বশেষ লালন ক্ষেত্র ছিল এবং এক পর্যায়
-
গত সাক্ষাৎকারে ঢাকার বিশিষ্ট খাবারের মধ্যে পোলাও, কাবাব, কোস্তা এবং কোরমার উল্লেখ করা হয়েছিল কিন্তু কোরমার বর্ণনা অনেক কিছু বাকি থাকতেই সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। বলার কথা এই যে, ঢাকায় কোরমার বিশেষ মসলা রয়েছে এবং ঢাকার বিশিষ্ট পরিবারে বিশেষ বিশেষ ভাবে রান্না হয়। দম পোস্তকে কোরমার মধ্যেই গণ্য করা উচিৎ। ঢাকায় দম পোস্ত যেমন সাধারণভাবে রান্না হয় তেমনটি অন্যত্র কম দেখা যায়। বড় আলুর দম পোস্ত অতি সাধারণ, কিন্তু বাঁধাকপির দম পোস্ত এখানকার বিশেষ আবিষ্কার। আমি বাঁধাকপির এর চেয়ে উত্তম কোনো ব্যবস্থা আর কোথাও দেখিনি এবং প্রকৃতই এটি উপযুক্ত খাবার জিনিস। এর স্বাদ অনেক দিন পর্যন্ত ভোলা যায় না। যদিও
-
কুস্তি সম্ভবত হিন্দুস্তানী বিষয়। কিন্তু তার দাও-পেঁচের নাম, যেমন 'নামাজবন্দ', 'একহাতি', 'কেইচি', 'দোহাতি', 'লঙ্গর' (শৃঙ্খল), 'কলাজং', 'মোযা" ইত্যাদি থেকে এটি পরিষ্কার বুঝা যায় যে, এটিকে মুসলমানরা তাদের নিজস্ব বিষয় করে নিয়েছে এবং আজও এই বিদ্যায় মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। যদিও এটা সত্য যে, পাহলোয়ান শব্দটি প্রাচীনতম ফার্সি শব্দ এবং ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষার সম্পর্কও প্রাচীনতম। ঢাকাতে এই বিদ্যাটি মোগল যুগে মুসলমানদের সাথে এসেছে। কিন্তু সে যুগের শুধুমাত্র একজন পাহলোয়ানেরই নাম আমাদের জানা আছে অর্থাৎ মির্জা মান্নার নামানুসারে মির্জা মান্নার দেউড়ি' আজও বর্তমান। তিনি সম্ভ্রান্ত শ্রেণির মধ্যে ছিলেন এবং নিজে ভীষণ পাহলোয়ান ও শক্তিশালী ছিলেন। কিন্তু ভাগীরথ ঠাকুর, যার নামানুসারে মাহুতটুলী মহল্লায়
-
খোকন, বাবা দেখ তো, ঘরে হুটোপুটি করছে কারা?
আমি তখন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের গা-শেতল-করা মিসমিদের কবচ-এর পাতায় ডুবে। প্রাচীনদের মনে না পড়েই পারে না-সেই যে বইয়ের গোড়ায় জানাল। গলিয়ে আসা চকচকে ছোরা বাঁধা বাঁশের আঁকশি দুহাতে ধরা গল্পের বিস্মিত নায়কের ছবিখানার কথা। প্রতুল ব্যানার্জির অতুল আঁকা ছবিটা আজও হানা দেয অতীত কাছে এসে দাঁড়ালে। আমি তখন সেই ভয়ংকর মুহূর্তে অদৃশ্য ছোরার সঙ্গে জুঝে চলেছি, এমন সময় রান্নাঘর থেকে মায়ের আদেশ। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখি আলমারির ওপরে যে বড় আয়না, তার সামনে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে ছোটো দুটো বানর লম্ফঝম্ফ করছে কিচিরমিচির শব্দে। আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিপক্ষদের দেখে
-
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। সেদিনকার ঢাকা শহরের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে সেই সময়কার ঘোড়ার গাড়ীর কথা। সেদিন যদি বলত, সামনে এমন দিন আসছে যেদিন শহরের বুক থেকে ঘোড়ার গাড়ীর নাম-নিশানা লোপ পেয়ে যাবে তা হলে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারতাম না। কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোড়ার গাড়ী নেই, গাড়োয়ানরা নেই, অথচ ঢাকা শহর চলছে এমন একটা কথা ভাবা যায়! অথচ আমার এই চোখের সামনে দিয়ে এই ঘটনাটা ক্রমে ক্রমে ঘটে গেল। আজ সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখুন, বড়জোর দশ-বারোটা ঘোড়ার গাড়ীর খোঁজ পাবেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে কখনো-কখনো তাদের
-
সেদিন বুড়ীগঙ্গার তীরবর্তী আমাদের এই বাকল্যাণ্ড বাঁধের কথা বলছিলাম আহমদউল্লাহ সাহেবের সাথে। বলছিলাম—কি ছিল আর কি হয়ে গেল! কি দেখেছিলাম সে সময় আর কি দেখছি আজ! দশ বছর আগে যে লোক ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে যদি আজ ফিরে আসে, তাহলে বাকল্যান্ড বাঁধের শ্রী দেখে সে তাজ্জব বনে যাবে। আর যদি আমার মতো নেশাখোর ভ্রমণার্থীদের কেউ হয়, তাহলে মর্মান্তিক আঘাত পাবে। কতোদিনের কতো স্মৃতি এই নদী আর এই নদীতীরের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে! এখন তাই একান্ত বাধ্য হয়ে না পড়লে ও পথে পা বাড়াই না। কেনো এমন হলো? এই বাকল্যান্ড বাঁধের পিছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা অনেকেরই হয়তো
-
লেখক: রফিকুল ইসলাম
১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ পূর্ব বাংলায় অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বায়ান্নোর একুশের প্রতীক ২১-দফার ভিত্তিতে হক-ভাসানী-সোহ্রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট তদানীন্তন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার পর শেরে বাংলার নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছিল। এ সরকার পঞ্চাশ দিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙে দিয়েছিল। সে সুযোগ অবশ্য করে দিয়েছিল '৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তড়িঘড়ি শেরে বাংলার নেতৃত্বে গঠিত কৃষক শ্রমিক দলের ক্ষমতা দখল। যুক্তফ্রন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আতাউর রহমান খানের আওয়ামী লীগ; কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকারে আওয়ামী লীগ প্রথমে যোগ দেয়নি, যদিও ওই দলের ১৪৩ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কৃষক
-
আপনি যদি কখনো শাহবাগের মোড়ে গিয়ে থাকেন, সেখানে দেখা পাবেন ঝরনা, কাজল, রিনা, মনোয়ারাদের। ওরা ফুল বিক্রি করে। মালা গাঁথে বিক্রি করার জন্য। আমরা তাদের বলব 'ফুলকন্যা'। ওরা ফুলের মতো সুন্দর, কিন্তু জীবনটা ফুলের মতো সুন্দর করে সাজাতে পারে না।
নানা রংবেরঙের ফুল দিয়ে সাজানোর মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের চির আনন্দের এবং বিশেষ অনুষ্ঠানের দিনগুলো উদ্যাপন করি। বিয়েবাড়ি, হলুদ, বউভাত সব অনুষ্ঠানই তার পূর্ণতা পায় হরেক রঙেয়ের ফুল দিয়ে সাজানোর মধ্য দিয়ে। আমাদের আনন্দের মুহূর্তগুলোর চিরসঙ্গী এই ফুল। আর এই ফুল বেচেই অনেক নারীর জীবন চলছে। শাহবাগে পাইকারি ফুলবিক্রেতা নারীদের সাথে কথা হচ্ছিল তাদের জীবন নিয়ে। সূর্য ওঠার আগে থেকেই
-
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়ে নজরুল ইসলাম বাক্শক্তিহীন ছিলেন। তার স্বাভাবিক চেতনা ছিল না, তথাপি পূর্ব পাকিস্তানের আমল থেকে কবিকে ঢাকা বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বেসরকারীভাবে কেউ কেউ বলতেন। তখনো সরকারীভাবে ঘোষিত না হলেও তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদার কথা চিন্তা করা হতো। এর বিপরীতে আরেকটি দিক ছিল জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েও তার গান ও কবিতার অঙ্গচ্ছেদ করার চেষ্টা হতো হিন্দুয়ানীর অভিযোগে। এভাবে যথেচ্ছ শব্দ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত কম ছিল না। পাকিস্তান আমলে ‘নওবাহার’ পত্রিকায় নজরুলের সমালোচনায় কবি গোলাম মোস্তফা লিখেছেন: “নজরুলকে পাকিস্তানের জাতীয় কবি বলিয়া অনেকে মনে করেন। কিন্তু নজরুলের সবচেয়ে বড় অপবাদ যদি কিছু থাকে, তবে এই।... পাকিস্তানের কবি হওয়া
-
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে ঢাকার রাজনৈতিক জগতের মানচিত্রটা বদলে যায় অনেক। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব সভ্যতার গতিধারাকে প্রবাহিত করে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মপ্রকাশ ভারতের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে যায়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের অভূতপূর্ব পদক্ষেপ, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ কোন্দল এসব তো ছিলই। ’৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ভারতীয় বিপ্লবীদের মেরুদণ্ডকে অনেকখানি শক্ত করে দিয়েছিল কেবল নয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বুকে ভীতির কম্পন জাগিয়েছিল। তাছাড়া বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সংকট ভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে যায়। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু গঠন করেন সর্বভারতীয় ফরোয়ার্ড ব্লক। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন সংগঠন
-
...গান-বাজনার পথটা ঢাকায় তিরিশ দশকেও বড়ো হেয় বলে গণ্য করা হত। কিন্তু সেইসঙ্গে একদিকে স্বদেশি গানের রেয়াজ আর অন্যদিকে ছিল ব্রহ্মসংগীতের প্রচলন। দেশাত্মবোধক নানা গানের প্রচলনের সঙ্গত কারণ ছিল। মুকুন্দ দাসের যাত্রা ঘুরে ফিরে পাড়ায় পাড়ায় চলত। দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের গানগুলোও প্রচলিত হয়েছিল। বিপ্লবী ভূপেন রক্ষিতে পিতা যোগেশ রক্ষিত, রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের গান শেখাতেন। তখন বাড়ির মেয়েরা, যারা স্কুলে যেত, তাদের মধ্যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সা রে গা মা সাধার প্রচলন হয়েছে। নিতান্ত ছেলেবেলায় স্কুলের প্রাইজ বিতরণী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের গান করেছিলাম । সেই থেকে বাড়িতে বাধা সত্ত্বেও গানের টান থেকে গেল। পাড়ায় কিশোরদের থিয়েটারের জন্য দাদার (বিপ্লবী অনিল রায়) ডাক এল। লীলাদির
-
বাংলার প্রথম মোগল গভর্নর ইসলাম খান', যাঁকে ঢাকার পুনরুজ্জীবিত আবাদীর প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়, তিনি এখানে মাত্র ৫ বৎসর ৩ সপ্তাহ ১৯ দিন বসবাস করেন এবং তাঁর পুরা শাসনকাল অধিকাংশই যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যবস্থাপনায় অতিবাহিত হয়েছে। মিস্টার শার্লীমেন তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ইসলাম খানের দরবারে বার শত 'কাঞ্চনী", নর্তকী চাকরিরত ছিল, যাদের পেশা ছিল নাচ-গান। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম খানের ঢাকায় আগমনের পূর্বেই ঢাকা যথেষ্টভাবে জন অধ্যুষিত ছিল এবং এখানে গান বাজনার প্রচুর চর্চা ছিল, অন্যথায় হঠাৎ করেই অথবা এত কম সময়ের মধ্যে বার শত কাঞ্চনী কোথা থেকে আগমন করবে? ইবনে বতুতার কাছ থেকেও এর সত্যতা
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.