অসহযোগ আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
লেখক: রফিকুল ইসলাম
১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ পূর্ব বাংলায় অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বায়ান্নোর একুশের প্রতীক ২১-দফার ভিত্তিতে হক-ভাসানী-সোহ্রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট তদানীন্তন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার পর শেরে বাংলার নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছিল। এ সরকার পঞ্চাশ দিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভেঙে দিয়েছিল। সে সুযোগ অবশ্য করে দিয়েছিল '৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তড়িঘড়ি শেরে বাংলার নেতৃত্বে গঠিত কৃষক শ্রমিক দলের ক্ষমতা দখল। যুক্তফ্রন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আতাউর রহমান খানের আওয়ামী লীগ; কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকারে আওয়ামী লীগ প্রথমে যোগ দেয়নি, যদিও ওই দলের ১৪৩ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কৃষক শ্রমিক দলের ৪৮ জন, নেজামে ইসলামের ২২ জন, গণতন্ত্রী দলের ১৩ জন আর খেলাফতে রব্বানী পার্টির ছিলেন ২ জন। শেরে বাংলা সরকার গঠনের পর কলকাতায় গিয়ে কিছু দায়িত্বহীন কথাবার্তা বলে পাকিস্তান সরকারকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁর মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়ার। শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্ট সরকারে যোগ দিলেও সরকারকে রক্ষা করতে পারেনি। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে '৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আর কোন ফ্রন্ট গঠন না করে এককভাবে প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল ৬-দফাকে গণভোটের ইস্যু করে। '৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মূল শক্তি ছিল '৬৯-এর গণআন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রসমাজ। অনেক ছাত্রনেতা ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর সর্বত্র এবং মহাপ্রলয়ে বিধ্বস্ত এলাকায় ১৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ২টি ছাড়া সবকটি আসন (পূর্ব পাকিস্তান থেকে) আর প্রাদেশিক পরিষদে ৩১০টির মধ্যে ২৯৮টি আসন আওয়ামী লীগ দখল করে। জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় পাকিস্তানের কেন্দ্রে এবং পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করার কথা। কিন্তু নির্বাচনের এই ফলাফল পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক ও আমলাতন্ত্রের সব হিসাবকে ভুল প্রতিপন্ন করায় ষড়যন্ত্র শুরু হয় জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর দ্বারা। '৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন হওয়ার সুযোগ দিয়ে পাকিস্তানী শাসক ও শোষকচক্র যে ভুল করেছিল, '৭০ সালের নির্বাচনের পর সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে গিয়ে তারা আরো বড় ভুল করে বসল। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের জঙ্গি শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া ৩ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদের ঢাকা অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দিলে সমগ্র পূর্ব বাংলা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। '৬৯-এর গণআন্দোলনের চাইতেও বড় আন্দোলন তথা সংঘাতের সূত্রপাত হয়। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ওই আকস্মিক ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকার বিক্ষুব্ধ মানুষ পথে নেমে আসে। ঢাকা একটি বিক্ষুব্ধ নগরীতে পরিণত হয়। জেনারেল ইয়াহিয়ার একটি সংক্ষিপ্ত বেতার ভাষণে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, দোকানপাট, কলকারখানা সব বন্ধ হয়ে যায়। চারদিকে শুধু সংগ্রামী জনতার জঙ্গি মিছিল, লক্ষ্য পল্টন ময়দান। হোটেল পূর্বাণীতে তখন আওয়ামী লীগ পরিষদ দলের জরুরি সভা চলছিল।
হোটেলের সামনে জনসমুদ্র, বিক্ষুব্ধ জনতা দিকনির্দেশনা চায়। বঙ্গবন্ধু সভা থেকে বেরিয়ে এসে জনতাকে সংযত করার চেষ্টা করেন। তিনি বিক্ষুব্ধ জনতাকে ধৈর্য না হারিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতির আহ্বান জানান। কিন্তু অধীর জনতা অবিলম্বে স্বাধীনতা ঘোষণার দাবি জানাতে থাকে। ওইদিন বিকেলে পল্টন ময়দানে এক স্বতঃস্ফূর্ত বিরাট জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ ছাত্রনেতা বক্তৃতা করেন। তাঁরা জনসাধারণকে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ও নির্দেশ মতো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান; কিন্তু ক্ষুব্ধ জনতা অবিলম্বে স্বাধীনতা ঘোষণার দাবি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments