বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব কি না, অথবা এর আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, সে নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সম্প্রতি এমন আরও একটি ধারাবাহিক বিতর্ক ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ হলো, যে কোন বিতর্কের অনাকাঙ্খিত ব্যক্তিগত আক্রমণগুলো বাদ দিলে এই বিতর্কে বিজ্ঞান শিক্ষা, সমাজে বিজ্ঞান চেতনার বিস্তার এবং সাধারণভাবে এগুলোর সাথে মাতৃভাষায় শিক্ষার সম্পর্কের প্রশ্নটি উঠে এসেছে দারুণভাবে। এই বিতর্কটির সবচে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল দেশে এবং বিদেশে অগ্রগণ্য কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার সাথে জড়িত ব্যক্তিত্বদের পর্যবেক্ষণজাত মতামত এবং পরামর্শ।
শুরুটা হয়েছিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর একটা প্রশ্ন থেকে, বাঙলায় সেটা দাঁড়াবে এমন: তো ছেলে-মেয়েরা, বিজ্ঞানকরার সময়ে ভাবনাটা আসে কোন ভাষায়, মাতৃভাষায়, না ইংরেজিতে?
এই ‘বিজ্ঞান-করিয়ে’দের উত্তরগুলো ছিল বিস্ময়কর। সংখ্যাল্প দু’একজন বাদে বাঙলার পক্ষেই সকলের একবাক্যে উত্তর। এদের কথার মূলসুর এই যে, ইংরেজিতে তাদের পড়তে এবং পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয় বটে, কিন্তু সেগুলো তারা বাংলাতেই আত্মস্থ করেন; বাংলাতে মনে রাখতে সুবিধা হয়; বিষয়গুলো ইংরেজিতে শেখার পরও দেখতে পান যে বাংলাতেই তারা চিন্তা করছেন; এমন উত্তরও এসেছে যে, চিন্তার কোন ভাষা নেই, সেটা একটা প্রক্রিয়া মাত্র। এদের মাঝে কেউ কেউ দীর্ঘ অভ্যাসে ইংরেজি ভাষায় চিন্তা করতে অভ্যস্ত হয়েছেন। অনেকেরই একটা সাধারণ বক্তব্য পরিভাষাগুলো ইংরেজিতেই আসে। যেমন, এমআইটির একজন শিক্ষার্থী বলেছেন “আমি term গুলা English এ চিন্তা করি, ফর্মুলা, কন্সট্যান্ট সব ইংলিশেই চোখে ভাসে কিন্তু এমনি যে theoretical ভাবনা সেটা তো মনে হয় কোন ভাষা ছাড়া ছবি দেখার মত কল্পনা করি। চুম্বক, পড়ন্ত বল, দোলক এর দোলন, DNA এর ভেঙে যাওয়া মনে মনে নিজেকে কিছু বুঝালে বা প্রশ্ন করলে সেটা মাতৃভাষাতে করি বলেই তো মনে হচ্ছে।”
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলেন, “টার্মগুলো ইংরেজিতেই মাথায় আসে, কিন্তু চিন্তাটা বাংলায় হয়। আসলে চিন্তা কী, সবই তো ভিজুয়ালাইজ, করি, ভাষার কথা মাথায় থাকে না তখন। সম্ভবত বাংলিশে ভাবি। স্যার, চিন্তার কী ভাষা থাকে? নিজেকে প্রশ্ন করার সময় অবশ্য বাংলা ব্যবহার করি।”
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে পিএইচডি গবেষণরত একজন মন্তব্য করেছেন: “মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা ততটাই জরুরী যতটা জরুরী সে ভাষায় কাব্য চর্চা। বিজ্ঞান চর্চায় মাতৃভাষার অপরিহার্যতা যারা বোঝেন না, আমি নিশ্চিত, তারা বিজ্ঞানের এই কাব্যময়তার সাথে পরিচিত নন।”
তো মোটামুটি এগুলোই হলো ওই প্রশ্নের উত্তরে আসা অধিকাংশ বিজ্ঞানকরিয়ের মতামত। এখান থেকে সাধারণভাবে জানা গেলা যে বাঙলাভাষী বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের সুবিপুল একটা অংশই চিন্তার ক্ষেত্রে বাঙলাই ব্যবহার করছেন, কিংবা ভাষাহীন ছবির জগতে চিন্তা করছেন, যদিও কাজের প্রয়োজনে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলোর বড় অংশটা ইংরেজি ভাষা থেকেই এসেছে। ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপনায় যুক্ত একজন শিক্ষক জানিয়েছেন জাপানি পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বাক্যটা থাকে জাপানিতে (মাতৃভাষায়), আর পরিভাষাগুলো থাকে দুই ভাষাতেই। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার একজন শিক্ষক আমাদের জানাচ্ছেন একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা “চিন্তা তো বাংলাতেই করতে হয়, কিন্তু scientific terms গুলোতো আমরা বাংলাতে কখনো শিখিই নাই। আমার ল্যাবে কিছু চায়নিজ আছে, ওরা অনেক ইংরেজি terms জানেই না। কিন্তু scientist হিসেবে যথেষ্ট ভালো।”
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক একটা দীর্ঘ মূল্যায়ন করেছেন, সংক্ষিপ্তাকারে তাকে উদ্ধৃত করছি: “প্রশ্নটার সোজা উত্তর, নিজের ভাষায় চিন্তা করি। বিজ্ঞান অবিজ্ঞান অপবিজ্ঞান সবক্ষেত্রেই। বাংলা যে বিজ্ঞান ধারণে অক্ষম, তার কারণ ভাষার দৈন্য নয়, তার কারণ বাংলা ভাষার ইনফ্লেক্সিবিলিটি। অবশ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা অতি সমৃদ্ধ দাবি করে নিজেরা নিজেরা পিঠ চাপড়াচাপড়ি করা আমাদের একটা জাতিগত আত্মম্ভরিতা। সর্বজনগ্রাহ্য এবং সর্বজনবোধ্য করার জন্য ইংরেজি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments