-
প্রথম আলোচনাতেই যেমন আমি বলেছি যে, ঢাকার বর্তমান মুসলিম বাসিন্দাদের সংস্কৃতিবান অংশ মোগল যুগের স্মৃতিবাহী। আজ তার উপর এতটুকু সংযোজন করছি যে, এখানে মোগল যুগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্মেনীয়দের বসবাস ছিল এবং সকলেই ধনী সওদাগর ছিলেন। শেষের দিকে তারা বড় বড় জমিদারী কিনে নিয়েছিলেন। এজন্য ঢাকার খাবার দাবারে আরমেনীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। অর্থাৎ এখানে কিছু প্রাচীনতম খাবার রয়েছে, কিছু ইরানি খাবার, কিছু আরমেনীয় খাবার আছে এবং কিছু ঢাকার সুন্দর রুচির উদ্ভাবন।
মিস্টার পিটার-এর ভাষায় পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদের রুচি হচ্ছে মিশ্রিত কাবাব এবং পোলাও। পোলাও দু'ভাবে রান্না হয়। সহজ পদ্ধতি হচ্ছে 'পাশানো', প্রথম চাউল সিদ্ধ করে নেয়া হয়,
-
এটা বাস্তব যে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে এখানকার বাসিন্দারা আজকের মতোই খালি মাথায় থাকত। মুসলমানগণ যখন এখানে আগমন করেন তখন তারা পাগড়ি বেঁধে আসেন এবং আজও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেননা এখানে যারা পশ্চিম থেকে আসেন, তারা পাগড়ি পরিধান করেই আসেন। অর্থ এই যে, ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান সবই পাগড়ি পরিহিত দেশ এবং আগমনকারীরা ঐ দিক থেকেই এসে থাকেন। অতঃপর ইসলাম ধর্মে পাগড়ির সম্মান রক্ষিত হয়েছে এবং ইমামতির জন্য পাগড়ি আবশ্যক করা হয়েছে।' এখানে (ঢাকাতে) দরবেশদের বংশ ছিল এবং তাঁরাও সর্বদা পাগড়ি ব্যবহার করতেন। সুতরাং ঢাকার বিখ্যাত খানকাসমূহ, মগবাজার এবং আজিমপুরের বুজর্গদের যে সব ছবি দেখা গেছে সবাইকেই এক বিশেষ ধরনের পাগড়ি
-
শবেবরাতের পরেই প্রত্যেক জায়গায় পবিত্র রমজানের আগমন হয়েছে বলে মনে করা হতো এবং বিশ তারিখের পর সব ধরনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হতো। আলহামদুলিল্লাহ্! শহরে মসজিদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং মাশাআল্লাহ, অধিকাংশগুলিতেই নামাজ পড়া হয়। মসজিদের চুনকাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ধনীদের বাড়িতে রাজমিস্ত্রি এবং মজুরদের আগমন রমজান শরিফের প্রকাশ্য পূর্বাভাস ছিল। গরিব লোকেরাও রমজানের চাঁদের পূর্বে নিজেদের ঘর স্বচ্ছ মাটি দিয়ে মুছে লেপে ঝক ঝকে তক তকে বানিয়ে ফেলত। প্রত্যেক বাড়িই ক্ষমতা অনুসারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করত এবং করাতো। ঘোড়োঞ্চি'বা জলকান্দা পর্যন্ত পরিষ্কার করা হতো। নতুন ঘড়া, মাটির নতুন হুক্কা, নতুন নৈচা ইত্যাদি আনা হতো এবং সুরভিত করে নেয়া হতো। তামাকের বিশেষ বন্দোবস্ত
-
তোরা: চুগতাই বা তুর্কী শব্দ। কার্যপ্রণালী, আইন এবং পদ্ধতি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ঢাকায় তোরাবন্দীর ভোজ বলতে সেই খাদ্য পরিবেশনকে বুঝাত যা সম্ভ্রান্ত বা অভিজাতদের বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে প্রচলিত ছিল। এই তোরাবন্দীতে বিশেষ শৃঙ্খলা এবং বিশেষ নিয়মে খাঞ্চা বণ্টন করা হতো। আমি যে সময়ে বুঝতে শিখেছি তখন তোরাবন্দীর আহার্য পরিবেশন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তোরাবন্দীর গঠন-আকৃতি এই শুনেছি যে, একটি বড় খাঞ্চায় (কান্তি) অথবা কয়েকটি খাঞ্চার মধ্যে মাটির পেয়ালায় এবং পেয়ালা-পাত্রসমূহে খাবার লাল বানাতে (মোটা পশমী কাপড়ের খানপোষে) ঢেকে অতিথিদের বাড়িতে পাঠানো হ'তো। ঐ সকল খাঞ্চায় চার ধরনের রুটি, চার ধরনের চাউল (ভাত), চার ধরনের রুটি-খাদ্য, চার প্রকারের কাবাব, চার
-
প্রাচীনকাল থেকেই পান হিন্দুস্থানের শোভা এবং নামসমূহের মধ্যে 'বাংলা পান', বাংলার বিশিষ্টতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলা পান যদিও বড় হয় এবং একটা পানেই গাল ভরে যায় কিন্তু তাতে কোনো সৌন্দর্য নেই এবং এই পানের ঝাঁঝ কোনো কোনো ঋতুতে অসহনীয় হয়ে যায়। পানের একটি প্রকার যাকে সাঁচি পান বলা হয় এটি অবশ্য নরম, ঝাঁঝ কম এবং স্বাদের দিক থেকেও ভাল, কিছুটা হলেও সুগন্ধি আছে। বাংলায় সর্বত্রই কম বেশি সাঁচি পান পাওয়া যায় এবং বিশিষ্ট লোকেরা এটিকে ব্যবহার করেন। এ কারণেই এখানকার একটি বাজারের নাম 'সাঁচি পান দরীবা", যা এখন বাজার নেই বরং মহল্লা হয়ে গেছে। এই পানের প্রকৃতি ঠাণ্ডা, এজন্য
-
দেশভাগের পর কলকাতার পাট ঢুকিয়ে যখন এক রত্তি ঢাকায় এলাম, তখন ব্রিটিশ-উত্তর যুগের সেই বাঘাহামা কালে বিনোদনের জায়গা বলতে ছিল ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ছটা প্রেক্ষাগৃহ রমনার রম্ভা 'ব্রিটানিয়া', সং বংশালের 'মানসী', কাচারি পল্লীর 'মুকুল', সদরের শোভা 'রূপমহল', উর্বশীসম 'লায়ন', চর্মে ঘর্ম আর্মেনিটোলার 'নিউ পিকচার হাউস', আর চকের চাকু 'তাজমহল'। পরে পঞ্চাশের দশকের মধ্যে গড়ে ওঠে মায়া (বর্তমানে স্টার), নিউ প্যারাডাইজ (অধুনালুপ্ত), গুলিস্তান, নাজ ও নাগরমহল (বর্তমানে চিত্রামহল)। কোনো নাট্যশালা নয়, কোনো চিড়িয়াখানা নয়, ভালো পার্ক নয়, সাংবৎসরিক সার্কাস নয়-কিছু না। তবে অপার সবুজের স্নেহসান্নিধ্য পেতে ছিল কিন্তু নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর বলধা গার্ডেনের আশ্চর্য সব তরুলতা ও বৃক্ষেরা-রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ক্যামেলিয়া থেকে শুরু করে
-
আমরা উঠলুম ৩৬ নম্বর কামিনীভূষণ রুদ্র রোডে, যার পোশাকি নাম চাঁদনী ঘাট। ১৯৪৮-এর ঢাকা। ব্রিটিশ আমলের পুরো গন্ধ তো ছিলই, মোগল আমলের ছিটেফোঁটা লালবাগ, আমলিটোলা, চকবাজার, মোগলটুলি, ইসলামপুর-এসব এলাকার অলিগলিতে যেন বা সেকালও উঁকি মারত। আমাদের এই হিসেবে প্রাউডলকের উদ্যান নগরী শ্যামলী রমনা হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো এক বিস্ময়। এ কথা বলা যাবে না নবাবি আমলের ঢাকা সম্পর্কে। বিদ্যুতের ব্যবহার তখনো সর্বগামী ছিল না। ফলে সন্ধে নামলেই সেকালের জেলা শহরগুলোর মতোই অন্ধকার নেমে আসত ঢাকার শিরা-উপশিরায়, বাড়ি বাড়ি জ্বলে উঠতো হারিকেন লণ্ঠনের আলো। মাঝে মাঝে খাপছাড়াভাবে কোনো কোনো ভাগ্যবানের বাড়ির জানালা গলিয়ে বিদ্যুতের ঝলমলে নরম আলো এসে পড়ত খোয়াভাঙা রাস্তার
-
সুত্রাপুরের ১৯নং ওয়ালটার রোডের বাড়িটাকে আজ ক’জনই-বা চেনে! কিন্তু আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে এই বাড়িটা পুরানো ঢাকা শহরের অধিবাসীদের অনেকের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় এই ঢাকা শহরে জমিদারদের সুপরিকল্পিত উচ্ছেদনীতির বিরুদ্ধে চান্দিনা স্বত্বের প্রজাদের এক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এই বাড়িটি আর তার স্রষ্টা ছিলেন এই বাড়ির মালিক মহম্মদ সফীউল্লাহ।
বিদ্যার দিক দিয়ে ম্যাট্রিক ফেল হলেও সফীউল্লাহ তাঁর নিজের পাড়ায় সুশিক্ষিত হিসাবেই গণ্য ছিলেন। এই অঞ্চলের স্থানীয় মুসলমান সমাজে ম্যাট্রিক পাস করা ছেলে তখন সুলভ ছিল না। কোনোকিছু নিয়ে লেখালেখি করার প্রয়োজন হলে পাড়ার লোক তাঁর কাছেই ছুটে আসত। ফলে তিনি মুখে
-
কবি সত্যেন দত্ত বহুদিন আগে মেথরদের উদ্দেশ করে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কে বলে তোমারে বন্ধু অস্পৃশ্য অশুচি?’ কিন্তু তা হলেও মেথর সম্প্রদায় আমাদের সমাজে এখনও অশুচি বলেই গণ্য। আর এই বৃত্তি অবলম্বন করার ফলে যেই পরিবেশের মধ্যে তাদের বাস করতে হয়, তা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষে একেবারেই প্রতিকূল। অথচ তারা তাদের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিলে সারা শহর-জীবন অচল হয়ে পড়বে। জননীর মতো, চিকিৎসকের মতো শহর-জীবনকে যারা সর্বভাবে পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত করে চলেছে তাদের কাজ কেমন করে নীচ ও মর্যাদাহানিকর হতে পারে? যাদের নিরলস সেবা সমাজের শুচিতাকে রক্ষা করে চলেছে, তারাই হলো অশুচি! মোটামুটি সবাই এই দৃষ্টি নিয়েই তাদের দেখে
-
পূজার নাটমণ্ডপগুলি নাচঘরে রূপান্তরিত হবার আগে পূজা উপলক্ষে যাত্রা, কবিগান, কীর্তন, কথকতা-এই সমস্তই চলত। নাচঘর নিয়ে এলো নতুন জিনিস-ঢপ, কীর্তন, খেমটা আর বাইজীদের নাচ-গান।
জীবন বাবুর বাড়ির নাচঘরের মালিক গোকুল রায়ের পিতা গৌরচন্দ্র রায় ঢপ, কীর্তন প্রবর্তন করেছিলেন। ঢপ পূর্ববঙ্গের কোথাও প্রচলিত ছিল না। ঢপ কীর্তনের দল কলকাতা থেকে আমদানী করা হতো। সাধারণ কীর্তনের মতোই এই বিশেষ ধরনের কীর্তন বঙ্গীয় বৈষ্ণব ধর্মের আদি ভূমি নবদ্বীপ, শান্তিপুর ও কাটোয়ার মাটিতে জন্মলাভ করেছিল। ঢপ কীর্তনের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, মেয়েরা এই কীর্তন গান গাইত।
পশ্চিম বঙ্গে বিশেষ করে কলকাতার নাগরিক আবহাওয়ায় খেমটা নাচ-গানের উৎপত্তি। কেউ কেউ মনে করেন সেখানকার হাফ আখড়াই গান
-
১৯৪৬ সাল। ঢাকা জেলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় বৎসর। আজ থেকে বাইশ বছর আগে এখানকার ৯,০০০ সুতাকল শ্রমিক দীর্ঘ তিন মাসব্যাপী ধর্মঘট সংগ্রাম পরিচালনার মধ্য দিয়ে সারা বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক রক্তরাঙ্গা অধ্যায় যোজনা করে দিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিক তথা মেহনতী জনতার এ এক গৌরবময় উত্তরাধিকার। আজ আমাদের এখানকার শ্রমিক ভাইরা আর যারা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁদের মধ্যে এমন ক’জন আছেন যাঁরা সেই সময়কার সেই সমস্ত রোমাঞ্চকর ঘটনার সঙ্গে পরিচিত? বিশেষ করে তাঁদের মনে করেই এই কাহিনী লিখতে বসেছি।
নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার ওপারে ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিল, এপারে ২নং ঢাকেশ্বরী কটন মিল, লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল, চিত্তরঞ্জন কটন
-
লেখক: রফিকুল ইসলাম
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি, নগ্ন সামরিক শাসন ব্যবস্থা এবং তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রী ব্যবস্থায় ১৯৬৫ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা আইনানুগ করার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী সামরিক নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্তি আর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের ক্ষমতার বাইরে রাখার নীলনকশা কার্যকর করা। সেই কঠোর সামরিক শাসনের মধ্যে ও পূর্ব বাংলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংস্কারবিরোধী ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখে দাঁড়ানোর আন্দোলন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কনভোকেশন হাঙ্গামাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও সংবাদপত্র নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী দুই অর্থনীতির জন্য আন্দোলন ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে সামরিক স্বৈরাচার ও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, যেসব আন্দোলনের
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.