ঢাকা শহরের নাচগান
পূজার নাটমণ্ডপগুলি নাচঘরে রূপান্তরিত হবার আগে পূজা উপলক্ষে যাত্রা, কবিগান, কীর্তন, কথকতা-এই সমস্তই চলত। নাচঘর নিয়ে এলো নতুন জিনিস-ঢপ, কীর্তন, খেমটা আর বাইজীদের নাচ-গান।
জীবন বাবুর বাড়ির নাচঘরের মালিক গোকুল রায়ের পিতা গৌরচন্দ্র রায় ঢপ, কীর্তন প্রবর্তন করেছিলেন। ঢপ পূর্ববঙ্গের কোথাও প্রচলিত ছিল না। ঢপ কীর্তনের দল কলকাতা থেকে আমদানী করা হতো। সাধারণ কীর্তনের মতোই এই বিশেষ ধরনের কীর্তন বঙ্গীয় বৈষ্ণব ধর্মের আদি ভূমি নবদ্বীপ, শান্তিপুর ও কাটোয়ার মাটিতে জন্মলাভ করেছিল। ঢপ কীর্তনের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, মেয়েরা এই কীর্তন গান গাইত।
পশ্চিম বঙ্গে বিশেষ করে কলকাতার নাগরিক আবহাওয়ায় খেমটা নাচ-গানের উৎপত্তি। কেউ কেউ মনে করেন সেখানকার হাফ আখড়াই গান ও ঝুমুর নাচের সংমিশ্রণে খেমটা নাচ-গান বিকাশ লাভ করে। পরে সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকা শহরেও খেমটার দলগুলি গড়ে ওঠে। খেমটা নাচের সর্বনিম্ন ইউনিট দু’জনকে নিয়ে এক জোড়ার কমে খেমটা চলতে পারত না। লোকে উৎসবাদি উপলক্ষে ২ জোড়া, তিন জোড়া, ৪ জোড়া যার যেমন সামর্থ্য সেই হিসাবে বায়না দিত। সে সময় সারা ঢাকা শহরে সবশুদ্ধ কুড়ি-বাইশ জোড়া খেমটাওয়ালী ছিল। ওদের মধ্যে মিলন, সরফু, পারুল, প্রমদা, নাটকী, ছুট্কি, বীণা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, চারু, মলিনা, হরিমতি, প্রিয়া (পিয়া নামে পরিচিত) প্রভৃতির নাম করা যেতে পারে। ওদের নাম-যশ যে শুধু ঢাকা শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয় সারা পূর্ব বঙ্গ, উত্তর বংগ, আসাম এবং বিশেষ করে চা-বাগান অঞ্চল থেকে এদের যথেষ্ট বায়না আসত।
এই দলগুলির মধ্যে একশ্রেণীর লোক ছিল, যারা ‘সফরদার’ নামে পরিচিত ছিল। তারা বাজনা বাজাত এবং খেমটাতে দালাল হিসাবেও কাজ করত। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষার্থিনী খেমটাদের নাচগানও শিক্ষা দিত। খেমটার দলের বাদ্যযন্ত্র-হারমোনিয়াম ২টি। একটি দলে দু’জন করে কীর্তন-ওয়ালী থাকত। একজন প্রধানা, দ্বিতীয়জন তার সহকারী প্রধানা গাইতে গাইতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে-দ্বিতীয়া তার বদলী হিসাবে গান ধরত। দু’জনেই রাধা বেশে গান করত। বৈষ্ণব শাস্ত্রে অভিজ্ঞ কীর্তনীয়ারা জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ঠাকুর, নরোত্তম দাস প্রভৃতি বিশিষ্ট পদকর্তাদের বাছা বাছা পদ চয়ন করে বিভিন্ন পালাগান তৈরী করতেন। কীর্তনওয়ালীরা এই গুরুদের কাছে শিক্ষা নিয়ে এই পালাগানগুলি গাইতেন।
খেমটা
‘খেমটা’ শব্দটি হাল্কা ধরনের তালের নাম। খেমটা গান ও নাচ দুটিই ছিল আদিরসাত্মক, হাল্কা চটুল।
তানপুরার মত সুরের রক্ষক হিসাবে, অপরটি বাজনার জন্য, সাধারণ সারেঙ্গী ২টি, মন্দিরা, বায়া-তবলা ইত্যাদি। কলকাতা থেকে যারা আসত তারা সারেঙ্গীর বদলে ২টি বেহালা ও ক্লারিওনেট ব্যবহার করত।
স্থানীয় খেমটাদের জন্য জোড়া হিসাবে গুণানুসারে দৈনিক ৩৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা দেওয়া হতো। কিন্তু যারা কলকাতা থেকে আসত তারা জোড়া হিসাবে দৈনিক ২০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পেত।
বাইজী
বাইজীদের নাচ-গানের রেওয়াজটা সম্ভবতঃ মোগলরা নিয়ে এসেছিল। বাইজীরা এককভাবে গান করত এবং এককভাবে নাচত। এদের গান ও নাচ, সংযত রুচিসম্পন্ন এবং খেমটাদের তুলনায় আভিজাত্য বোধের পরিচায়ক ছিল। বাইজী ও খেমটার নাচের মধ্যে মূল পার্থক্য এই যে, তাদের নাচের মধ্যে পায়ের কাজটাই ছিল প্রধান এবং তার নৃত্যভঙ্গির মধ্য দিয়ে যৌন আবেদন সৃষ্টি করে তুলতে চাইত। অপরপক্ষে বাইজীর নাচে প্রধান ছিল হাতের দোলা ও মুখ, চোখ, নাক ও ওষ্ঠের সূক্ষ্ম কম্পন।
স্থানীয়ই হোক আর বাইরে থেকে আমদানী হোক, কোনো বাইজী বাংলা গান গাইত না। এখানকার আসরে এক ধরনের হিন্দী বা উর্দু গান গাওয়া হতো।
বাইজীদের নাচ-গানের সঙ্গে দুইটি বেনারসী সারেঙ্গী, বেনারসী তবলা, বেনারসী মন্দিরা ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। এগুলি আকারে সাধারণ সারেঙ্গী, তবলা ও মন্দিরার চেয়ে বড়। বাইজীরা যখন নাচত তখন যন্ত্রীরা তাদের সঙ্গে সঙ্গে বাজনা বাজিয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments