ঢাকা শহরের বাইশ পঞ্চায়েত
ঢাকা শহরের সুরসিক লোকেরা এককালে তাদের শহরের আর একটা নামকরণ করেছিল-‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি।’ সেই নাম আজ বিস্মৃতির পথে হারিয়ে গেছে। এই বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির উপরে বাইশ পঞ্চায়েত তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিয়ে সমাজ রক্ষার কাজ চালাত। তাদের কথার উপর কারুর কথা বলা চলত না। বাইশ পঞ্চায়েত আজও বেঁচে আছে। কিন্তু একে বেঁচে থাকা বলা চলে না। তার মূলগুলো একটা একটা করে মরে যাচ্ছে, ডালগুলো অবসন্ন হয়ে শুয়ে পড়েছে। পাতাগুলো খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে এলো বলে। কালের অমোঘ বিধান কে লংঘন করতে পারে। এমন প্রবল প্রতাপশালী সরদার আর তাদের পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা! কালের বিধানে তাদেরও আজ সসম্মানে সরে গিয়ে নবাগত ইউনিয়ন কমিটিকে জায়গা করে দিতে হচ্ছে। অবশ্য ইউনিয়ন কমিটি প্রবর্তনের আগেই, এখানকার বাইশ-পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা নিজ থেকেই ‘উইদার এওয়ে’ অর্থাৎ শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছিল। চেষ্টা করলেও এই স্বাভাবিক মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা যেত না। যে অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর দাঁড়িয়ে পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা এক সময়ে সজীব ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করে চলেছিল বহুদিন আগে তাতে ভাঙ্গন ধরেছিল। সেই জন্যই তা আজ দাঁড়াবার মতো মাটি পাচ্ছে না। নতুন মুদ্রার পাশাপাশি পুরানো মুদ্রার মতো পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা আজও কোনোমতে তার অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু পুরানো মুদ্রার মতো তার দিনও শেষ হয়ে এসেছে। ‘বাইশ পঞ্চায়েত’ আজও লোকের মুখে মুখে প্রচলিত কিন্তু সেদিন হয়তো দূরে নয়, যেদিন ভবিষ্যদ্বংশীয়দের কাছে এই কথাটি অপরিচিত হয়ে যাবে।
‘পঞ্চায়েতী’ কথাটি পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্র প্রচলিত। ‘পাঁচ’ সংখ্যাটি আমাদের এই অঞ্চলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নানা ব্যাপারেই পাঁচ সংখ্যাটির প্রয়োগ দেখা যায়। এর পিছনে রয়েছে ‘হাতের পাঁচ আঙ্গুল’ এটা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়। কিন্তু সমাজ পরিচালনার জন্য এই যে পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা, এটা আমাদের এদিককার কোনো অভিনব আবিষ্কার নয়। এই ব্যবস্থা সার্বজনীন। পৃথিবীর সব দেশেই এর প্রচলন ছিল বা আছে। প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ এই ব্যবস্থার উদ্ভাবন করতে বাধ্য হয়েছে। সভ্যতার অভ্যুদয়ের বহু আগে থেকেই এই ব্যবস্থা প্রচলিত হয়ে এসেছে।
ফরাশগঞ্জ ইউনিয়ন কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান জনাব আহমদুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে বাইশ পঞ্চায়েত সম্পর্কে আলাপ হচ্ছিল। এখানে এ সম্পর্কে যেটুকু তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে তা তাঁর কাছ থেকেই সংগৃহীত। অবশ্য তথ্যের পরিমাণ অপ্রচুর। প্রাচীন দিনের নথিপত্র সুরক্ষিত না থাকার ফলে এই বাইশ পঞ্চায়েতের উৎপত্তি ও ক্রম-পরিণতির ইতিহাসটা আমাদের কাছে একেবারেই ঝাপসা। এই ইতিহাসটা পেলে তা থেকে এখানকার অতীত দিনের সামাজিক জীবনের অনেক ছবি হয়তো আমরা পেতে পারতাম।
আহমদুল্লাহ সাহেব বলছিলেন, ঢাকা শহরের সরদারী প্রথা ঢাকার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের মধ্যে চলে আসছিল। কথাটা শুনলে মনে হতে পারে, এখানকার পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা নবাব পরিবারেরই সৃষ্টি। কিন্তু এ কথাটা তো আর সত্য হতে পারে না। গত শতাব্দীর কোনো এক ভাগে হয় তো প্রথমাংশে এই নবাব পরিবার বাইরে থেকে এখানে এসেছিলেন। কিন্তু পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা তার বহু আগে থেকে প্রচলিত হয়ে এসেছে, সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। কেননা, কি গ্রামাঞ্চলে কি পুরানো শহরে সর্বত্রই প্রাচীনকাল থেকে পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা কার্যকরী হয়ে আসছিল এবং প্রধান বা মহৎ বা মাতবর বা সরদাররা সেই ব্যবস্থার মূল ভূমিকা গ্রহণ করে আসছিলেন। কিন্তু তা হলেও ঢাকা শহরের বাইশ পঞ্চায়েতের সঙ্গে নবাব পরিবারের কার্য-কারণ সম্পর্ক ছিল, এই ধারণাটাকে একেবারে অসত্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই বাইশ পঞ্চায়েত কবে সৃষ্টি হয়েছিল, সে ইতিহাস আজও আমাদের জানা নেই। তবে যে কোনোভাবইে হোক, এই বাইশ মহল্লার মুসলমানদের উপর এই নবাব পরিবার বিপুল প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করতে পেরেছিলেন। এই প্রভাবের জোরে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments