রমনার স্মৃতি
রমনার স্মৃতি কখনও ভুলবার নয়। ঢাকায় ফিরে আসা প্রবাসী, বা যাদের ত্যাগ করতে হয়েছে সাধের ঢাকা শহর, ঢাকাবাসী মধ্যবয়সী বা বৃদ্ধ যখনই বোনেন পুরনো কথার জাল, তখনই ফিরে ফিরে আসে রমনা। কারো কাছে পঞ্চাশ ষাট বছর আগের রমনা মোহময়ী, কারো কাছে বা কুড়ি ত্রিশ বছর আগের। একেক বয়সের কাছে একেক রূপের রমনা। বুড়িগঙ্গার কথা মনে পড়লে যেমন চলে আসে ঢাকার নাম, তেমনি ঢাকার কথা মনে হলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে রমনার বিস্তৃত মাঠ।
রমনার সীমা, প্রকৃতি, একেক বয়সীর কাছে একেক রকম। কারণ, কিছু দিন আগেও নির্দিষ্ট ছিল না রমনার সীমা। পুরনো হাইকোর্ট থেকে শুরু করে রমনা পার্ক, তারপর রমনা পার্ক পেরিয়ে মিন্টো রোড, শাহবাগ, পুরো নীলক্ষেত এলাকা, কার্জন হল থেকে মেডিকেল-কখনও কখনও পুরো অঞ্চলটিকেই বোঝানো হতো রমনা বলে। সেই বিরাট এলাকা এখন সঙ্কুচিত হয়ে টিকে আছে রমনা পার্কেই। বর্তমান প্রজন্মের কাছে শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা নীলক্ষেত আলাদা আলাদা একক। পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে পুরো এলাকাটিই রমনা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত শাহবাগ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানও।
রমনার সীমা এখন যাই হোক না কেন, পুরো এলাকাটি সেই মুঘল যুগ থেকে এখন পর্যন্ত একটি বিশেষ এলাকা হিসেবেই রয়ে গেছে। এমনটি আর ঢাকার কোন এলাকার ব্যাপারে হয়নি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঢাকা শহরে সবচেয়ে দামী এলাকা ছিল শাঁখারীবাজার ও তাঁতি বাজার।' পাকিস্তান আমলে ধানমণ্ডি, এখন আবার বনানী, বারিধারা। কিন্তু রমনার আভিজাত্য ঠিকই রয়ে গেছে। মুঘল আমলে ছিল এটি অভিজাত এলাকা, কোম্পানী আমলে এলাকাটি হয়ে পড়েছিলো জঙ্গলাকীর্ণ। আবার যখন সাফ করা হলো, তখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এলিটদের বিনোদন কেন্দ্র। এ শতকেও রমনা ছিল পরিপাটি একটি এলাকা, যার সঙ্গে তুলনা চলতো না অন্য এলাকার। আর এখনও তাই আছে, সৌন্দর্য বা জমির দাম- যেটিকে পরিমাপের একক হিসেবে ধরি না কেন। হয়তো ভবিষ্যৎ-এও তাই থাকবে।
সেই মুঘল আমল (১৬১০) থেকেই বিশেষ এলাকা হিসেবে রমনার ইতিহাসের শুরু। ঐ সময় বর্তমান নীলক্ষেত অঞ্চলে মহল্লা চিশতিয়ান এবং মহল্লা শুজাতপুর নামে গড়ে উঠেছিলো দুটি আবাসিক এলাকা। শুজাতপুর ছিল বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন থেকে বাংলা একাডেমী পর্যন্ত। পুরনো রেসকোর্সের দক্ষিণ পশ্চিমে ছিল চিশতীয়া। পুরো এলাকাটি ছিল মৌজা শুজাতপুরের অন্তর্গত। মৌজা শুজাতপুর নাম হয়েছিলো রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা ইসলাম খাঁ চিশতীর ভাই শুজাত খান চিশতীর নামে।'
শুজাতপুর মৌজা বা মহল্লা চিশতীয়া ও মহল্লা শুজাতপুরে মুঘলরাই বসবাস করতেন। 'চিশতীয়ায়' ইসলাম খাঁ চিশতীর বংশের কিছু সদস্য বসবাস করতেন। একারণেই মহল্লার নাম ছিল চিশতীয়া। তাঁদের অনেকের কবরও দেওয়া হয়েছিলো এখানে। পরবর্তীকালে এলাকাটির নাম দেওয়া হয়েছিলো 'পুরনো নাখাস' যার মানে পুরনো দাসবাজার। খুব সম্ভব, মুঘল আমলে, এখানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী বিক্রি করা হতো।
রমনা নামকরণ মুঘলদেরই। ফার্সী শব্দ এটি, ইংরেজিতে যার অর্থ ল'ন। বাংলায় ঠিক এর প্রতিশব্দ আছে কিনা জানি না। তাইফুর জানিয়েছেন, পুরোনো হাইকোর্ট ভবন থেকে নিয়ে বর্তমান সড়ক ভবন পর্যন্ত মুঘলরা তৈরি করেছিলেন বাগান, যার নাম ছিল 'বাগ-ই-বাদশাহী' বা 'বাদশাহী বাগান'। ১৯০৩ সালে, তিনি নিজে হাইকোর্ট এলাকায় বিশাল এক ফটক দেখেছিলেন যেটি তাঁর মতে ছিল খুব সম্ভব 'বাদশাহী বাগানের' ফটক। ১৯০৪-৫ সালে নতুন রাজধানী নির্মাণ কালে ভেঙে ফেলা হয়েছিলো এই ফটক এবং এ এলাকার অনেক পুরনো বাড়িঘর।
ধরে নিতে পারি, পুরো রমনা এলাকাটি মুঘল আমলে ছিল এ রকম- দক্ষিণ পূর্বে বা বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সড়ক ভবন পর্যন্ত সাজানো বাদশাহী বাগান। কলাভবন, কার্জন হল থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে দু'টি আবাসিক এলাকা- মহল্লা শুজাতপুর ও মহল্লা চিশতীয়া, যেখানে তাইফুরের মতে ছিল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments