প্রথম কবি ও প্রথম কাব্য
তমসা নদীর ধারে বাল্মীকি মুনির তপোবন ছিল। দু-ধারে গভীর বন, তাহার মাঝখান দিয়া সুন্দর ছোট নদীটি কুল-কুল করিয়া বহিতেছে। তাহার জল এতই পরিষ্কার যে তলার বালি অবধি স্পষ্ট দেখিতে পাওয়া যায়। একটু কাদা নাই, একগাছিও শ্যাওলা নাই। কাঁচের মত টলটল করিতেছে। বাল্মীকি নদীর ধারে বেড়াইতে আসিলেন, আর সেই নির্মল জল দেখিয়া তাঁহার মনে বড়ই সুখ হইল। সঙ্গে তাঁহার শিষ্য ভরদ্বাজ ছিলেন, তাঁহাকে তিনি বলিলেন, ‘দেখ ভরদ্বাজ, নদীর জল কী নির্মল, যেন সাধু লোকের মন। আমার বল্কল দাও, আমি এইখানে স্নান করিব।’
সেইখানে দুটি বক নদীর ধারে খেলা করিতেছিল। এমন সুন্দর দুটি পাখি এবং তাহাদের এমন মিষ্ট ডাক, আর তাহারা মনের আনন্দে এমনি চমৎকার খেলা করিতেছিল যে, দেখিয়া মুনি আর চোখ ফিরাইতে পারিলেন না। পাখি দুটির উপর মুনির কেমন স্নেহ জন্মিয়া গেল, তিনি স্নানের কথা ভুলিয়া কেবলই তাহাদের খেলা দেখিতে লাগিলেন।
এমন সময় কোথা হইতে এক দুষ্ট ব্যাধ আসিয়া পাখি দুটির পানে তীর ছাড়িয়া মারিল। এমন সুখে পাখি দুটি খেলা করিতেছিল, তাহাদের কোন দোষ ছিল না, কোন বিপদের কথা তাহারা জানিত না। এমন নিরীহ জীবকে বধ করে নিষ্ঠুর লোক হয়? তীর খাইয়া পুরুষ পাখিটি যাতনায় ছটফট করিতে লাগিল, মেয়েটি শোকে আর ভয়ে কাঁদিয়া আকুল হইল।
মুনি আর এ দুঃখ সহিতে না পারিয়া ব্যাধকে বলিলেন, ‘ওরে ব্যাধ, এমন সুখে পাখিটি খেলা করিতেছিল, তাহাকে তুই বধ করিলি? তোর কখনই ভাল হইবে না।’
দয়ালু মুনির মনের দুঃখ তাঁহার চোখের জলের সঙ্গে সঙ্গে এই কথাগুলির ভিতর দিয়া ফুটিয়া বাহির হইল।
সেই কথায় আপনা হইতেই ছন্দ আসিয়া তাহা কবিতা হইয়া গেল। সেই কবিতাই সকলের প্রথম কবিতা, তাহার পূর্বে কেহ কবিতা রচনা করে নাই।
মুনি আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, ‘এ কী চমৎকার কথা আমি বলিলাম! আমি কিছুই জানি না, তবু ইহাতে বীণার ছন্দের মত কেমন সুন্দর ছন্দ হইল। ইহার চারিভাগে সমান সমান অক্ষর হইল। আমি বলি ইহার নাম শ্লোক হউক, কেননা আমার শোকের সময় ইহা মুখ দিয়া বাহির হইয়াছে।’
ভরদ্বাজও বলিলেন, ‘গুরুদেব। কী সুন্দর কথা। এমন কথা তো কেহ আর কখনো বলে নাই। ইহার নাম শ্লোকই হউক।’
তারপর মুনি স্নান করিয়া ঘরে আসিয়া সেই সুন্দর সুন্দর ছন্দের কথা ভাবিতেছেন এমন সময় ব্রহ্মা আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। পাখি দুইটির দুঃখে কাতর হইয়া মুনি আর ব্রহ্মাকে অন্য কথা বলিবার অবসর পাইলেন না, তাঁহাকে সেই দুষ্ট ব্যাধের কথা বলিয়া সেই কবিতাটি গাহিয়া শুনাইলেন।
তাহা শুনিয়া ব্রহ্মা বলিলেন, ‘বাল্মীকি, তোমার এ কবিতার নাম শ্লোকই হউক। এইরূপে শ্লোক লিখিয়া তুমি রামের বৃত্তান্ত রচনা কর। সে বড় সুন্দর কাহিনী, তাহা যে পড়িবে তাহারই মঙ্গল হইবে। তুাম যাহা লিখিবে তাহার একটি কথাও মিথ্যা হইবে না। যতদিন পৃথিবীতে পর্বত আর নদীসকল থাকিবে, ততদিন লোকে তোমার রামায়ণের আদর করিবে; আর যতদিন রামায়ণের আদর থাকিবে তুমি স্বর্গে গিয়া ততদিন অমরলোকে থাকিতে পাইবে।’
এই বলিয়া ব্রহ্মা চলিয়া গেলে, তাঁহার কথাগুলি মনে করিয়া বাল্মীকি ঠিক করিলেন, ‘এইরূপ মিষ্ট শ্লোক দিয়া আমি রামায়ণ রচনা করিব।’
তারপর সেই ধার্মিক মুনি কুশাসনে বসিয়া জোড় হাতে ভগবানকে স্মরণপূর্বক রামায়ণ লিখিতে আরম্ভ করিলেন। ক্রমে রামায়ণ শেষ হইল। তখন মুনি ভাবিলেন, ‘কাব্য তো শেষ হইল, এখন ইহা গাহিবে কে?’
ঠিক সেই সময়ে ‘কুশী’, ‘লব’ দুই ভাই আসিয়া তাঁহাকে প্রণাম করিলেন। দুটি ভাই রামেরই পুত্র, মুনির বেশে সেই আশ্রমে থাকিয়া লেখাপড়া শেখেন। দেবতার মতন সুন্দর; গন্ধর্বের মতন মিষ্ট গান গাহেন।
মুনি বলিলেন, ‘এরাই আমার রামায়ণের উপযুক্ত গায়ক।’
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments