ঢাকা শহরের রিকশাওয়ালা
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। সেদিনকার ঢাকা শহরের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে সেই সময়কার ঘোড়ার গাড়ীর কথা। সেদিন যদি বলত, সামনে এমন দিন আসছে যেদিন শহরের বুক থেকে ঘোড়ার গাড়ীর নাম-নিশানা লোপ পেয়ে যাবে তা হলে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারতাম না। কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোড়ার গাড়ী নেই, গাড়োয়ানরা নেই, অথচ ঢাকা শহর চলছে এমন একটা কথা ভাবা যায়! অথচ আমার এই চোখের সামনে দিয়ে এই ঘটনাটা ক্রমে ক্রমে ঘটে গেল। আজ সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখুন, বড়জোর দশ-বারোটা ঘোড়ার গাড়ীর খোঁজ পাবেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে কখনো-কখনো তাদের মধ্যে কোনো একটির সঙ্গে যখন দেখা হয়ে যায় তখন রীতিমত চমকে উঠতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ফেলে আশা সেই নোংরা আর শ্রীহীন ঢাকা শহরটার কথা ভেবে মনটা ব্যথায় মোচড় দিয়ে ওঠে। আজ সারা শহরের পথে যেদিকে তাকান শুধু রিকশা, রিকশা আর রিকশা। অতীত দিনের স্মৃতিচিহ্ন মাত্র এই কটি ঘোড়ার গাড়ী কে জানে কি করে এখনও টিকে আছে। এদের দিনও শেষ হয়ে এলো বলে।
সম্ভবত ১৯৩৬ কি ১৯৩৭ সালের কথা। সন, মাস, তারিখ মিলিয়ে বলতে না পারলেও মোটামুটি এই সময়টাই হবে। এই সময় মৌলভী-বাজারের দু’জন উদ্যোগী লোক পশ্চিম বঙ্গের ফরাসী উপনিবেশ চন্দননগর থেকে দু’খানা রিকশা আনালেন। দুখানাই সাইকেল রিকশা। ঢাকা শহরে এই সর্বপ্রথম রিকশা এসে ঢুকল। এই দুই ব্যক্তিকে, তাঁদের নামধাম পরিচয় দিতে পারছি না বলে আমি দুঃখিত, তবে তাঁদের দু’জনের মধ্যে একজনের সম্পর্কে শুধু এইটুকুই বলতে পারি, তিনি ছিলেন একজন ডাক্তার। মৌলভীবাজারের গোশ্ত পট্টীর সামনেই ছিল তাঁর ডিস্পেনসারী। এই শহরে রিকশা চালু করার ব্যাপারে এরাই ছিলেন পথপ্রদর্শক। এর বেশী আর কিছু বলতে পারব না। এদের সম্পর্কে আপাততঃ এইটুকু জেনেই তুষ্ট থাকতে হবে।
ব্যবসা করবার উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁরা এই রিকশা আনিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম দিকে ব্যবসাটা তেমন Smooth sailing হয়নি। ব্যবসাটা জমিয়ে তুলতে বেশ একটু সময় লেগেছিল। তার কারণ, প্রথম প্রথম এখানকার অনেকে আর একজন লোকের ঘাড়ে চেপে চলাচল করতে লজ্জা পেত। কেউ রিকশা চেপে চললে রাস্তার ছেলেরা হল্লা করে তার পিছন পিছন ছুটত। বেচারার অবস্থাটা কি দাঁড়াত, ভেবে দেখুন একবার। আমার এক বন্ধুর মুখে শুনেছি, তিনি সন্ধ্যার পর রিকশা চেপে বেরোতেন। প্রকাশ্য দিবালোকে রিকশায় বসে পরিচিত লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইতেন না। এযুগের লোক এ সমস্ত কথা শুনলে হয়তো আশ্চর্য হয়ে যাবে। অভ্যাসের ঘষায় ঘষায় আমাদের সুকুমার মনোবৃত্তি, এমন কি চক্ষুলজ্জাটুকু পর্যন্ত ভোতা হয়ে যেতে বসেছে। এই ক্ষতি বড় সহজ স্মৃতি নয়।
মৌলভীবাজারে সর্বপ্রথম যে দু’খানা রিকশা আনা হয়েছিল তাদের দাম পড়েছিল ১৮০ টাকা করে। আকারের দিক দিয়ে এখনকার রিকশার সঙ্গে তাদের কিছুটা তফাৎ ছিল। উপরটা ছিল খোলা-মাথার উপর এখনকার মত হুডও ছিল না, পর্দাও ছিল না। আমাদের এই বর্ষা প্রধান দেশে প্রয়োজনের তাগিদে হুড আর পর্দার প্রবর্তন হতে বেশী সময় লাগল না।
মৌলভীবাজারের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকেরা রিকশা আমদানী করতে থাকে। স্থানীয় মুসলমানরা ও স্থানীয় বসাকরা এই বিষয়ে সব চেয়ে বেশী উদ্যোগী ছিল। একেবারে প্রথম দিকে যারা রিকশাচালকের বৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে দুজনের নাম বলছি: ১. ফরাশগঞ্জ লেন নিবাসী জামাল মিয়ার ভাই মহম্মদ সোনা মিয়া, ২. মালাকরটোলা নিবাসী হীরেন্দ্র সাহা। সে সময় রিকশার মালিকের আয় ছিল দিনে ১।০ থেকে ১॥০ টাকা। রিকশাচালক দিনে ৩ টাকা থেকে ৩॥ টাকা উপার্জন করত। সদরঘাট থেকে চকবাজার যেতে মাথা প্রতি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments