ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
লেখক: রফিকুল ইসলাম
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি, নগ্ন সামরিক শাসন ব্যবস্থা এবং তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রী ব্যবস্থায় ১৯৬৫ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা আইনানুগ করার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী সামরিক নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্তি আর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের ক্ষমতার বাইরে রাখার নীলনকশা কার্যকর করা। সেই কঠোর সামরিক শাসনের মধ্যে ও পূর্ব বাংলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংস্কারবিরোধী ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখে দাঁড়ানোর আন্দোলন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কনভোকেশন হাঙ্গামাকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও সংবাদপত্র নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী দুই অর্থনীতির জন্য আন্দোলন ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে সামরিক স্বৈরাচার ও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, যেসব আন্দোলনের উৎসকেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলধারা ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ষাটের দশকে সামরিক শাসনের আবরণে পশ্চিম পাকিস্তান তথা পাঞ্জাবি শাসন-শোষণ অবসানের জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেই লক্ষ্য স্থির করে স্বাধিকার আন্দোলন করছিল। '৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের উন্মাদনা ও ভারতবিরোধী প্রচারণা যখন তুঙ্গে, তখন এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত এবং ভারতের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বাজেটের সিংহভাগ খরচ হয়েছে সামরিক খাতে। মার্কিন সামরিক সহায়তা এবং পাকিস্তানের সামরিক বাজেটের শতকরা নব্বইভাগের বেশি পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়।
পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল পাঞ্জাবি, তার পরে পাঠান ও বালুচরা। পাকবাহিনীতে বাঙালি ও সিন্ধিদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মেজর গনির উদ্যোগে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হলেও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এ রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়ন সংখ্যা দশটিতেও পৌঁছায়নি। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালি সৈনিক ও অফিসাররা ছিলেন উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে আগত অফিসারদের মধ্যে মেজর জেনারেল মজিদ ছিলেন প্রবীণতম। এই বাঙালি অফিসার যাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্টাফ না হতে পারেন, সে জন্য তাঁকে রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে বরখাস্ত করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে নয় মাস শেরেবাংলা নগরে 'ভিআইপি কেজ' নামক পাকিস্তান বাহিনীর বন্দিশিবিরে আটক রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে লাহোরের কাছে বেদিয়া সেক্টরে মোতায়েন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন লে. কর্নেল এটিকিউ হকের কমান্ডে যথার্থ ব্যাঘের শৌর্যবীর্য নিয়ে লড়াই করে সুনাম অর্জন করেছিল। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে যে ব্যাটালিয়নের সৈনিকরা সবচেয়ে বেশি বীরত্বের পদক লাভ করে, সেটি ছিল বেঙ্গল টাইগার্সের প্রথম ব্যাটালিয়ন। এই ব্যাটালিয়নে অফিসারদের মধ্যে ছিলেন মেজর মংশোয়া, ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান প্রমুখ। অথচ যুদ্ধশেষে প্রচলিত রীতিতে ওই ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে কর্নেল এটিকিউ হককে সরাসরি ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত না করে কর্নেল পদ দিয়ে সেনাবাহিনীর বাইরে রেঙ্গুনে সামরিক অ্যাটাশে নিয়োগ করা হয়। ফলে দুঃখ-বেদনায় ওই বীর সেনাপতি শেষ পর্যন্ত ইন্তেকাল করেন, যার কবর রয়েছে বনানী সামরিক গোরস্তানে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরে পাকিন্তান সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালিদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্য দূর করার কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মোট ব্যাটালিয়নের সংখ্যা দশটির বেশি হয়নি। পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রবীণতম অফিসার রিয়ার অ্যাডমিরাল রশীদকে বাঙালি বিধায় নৌপ্রধান করা হয়নি। বিমান বাহিনীতেও একই অবস্থা ছিল।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের কাগজপত্রে 'ফোরটি ডিভিশন' বা 'চতুর্দশ ডিভিশন' নামে একটি ডিভিশন থাকলেও আসলে পাকিস্তান বাহিনী পুরো এক ডিভিশন ছিল না, বিমান বাহিনীতে স্যাবারজেট বিমান পুরো এক স্কোয়াড্রনও ছিল না, উপকূল রক্ষার জন্য বস্তুতপক্ষে কোনো যুদ্ধজাহাজ ছিল না। মোটকথা ১৯৪৭-৬৫ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান রক্ষার দায়িত্ব ছিল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments