সদরঘাটের বাকল্যান্ড বাঁধ
সেদিন বুড়ীগঙ্গার তীরবর্তী আমাদের এই বাকল্যাণ্ড বাঁধের কথা বলছিলাম আহমদউল্লাহ সাহেবের সাথে। বলছিলাম—কি ছিল আর কি হয়ে গেল! কি দেখেছিলাম সে সময় আর কি দেখছি আজ! দশ বছর আগে যে লোক ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে যদি আজ ফিরে আসে, তাহলে বাকল্যান্ড বাঁধের শ্রী দেখে সে তাজ্জব বনে যাবে। আর যদি আমার মতো নেশাখোর ভ্রমণার্থীদের কেউ হয়, তাহলে মর্মান্তিক আঘাত পাবে। কতোদিনের কতো স্মৃতি এই নদী আর এই নদীতীরের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে! এখন তাই একান্ত বাধ্য হয়ে না পড়লে ও পথে পা বাড়াই না। কেনো এমন হলো? এই বাকল্যান্ড বাঁধের পিছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা অনেকেরই হয়তো জানা নাই। পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় এক মাইল লম্বা এবং গড়ে ৩০ ফুট প্রশস্ত বাকল্যান্ড বাঁধ বছর কয়েক আগেও মিউনিসিপ্যালিটির সম্পত্তি ছিল। এখন এই সম্পত্তির মালিক I.W.T.A (Inland water transport Authority) বা আভ্যন্তরীণ পানি পরিবহণ কর্তৃপক্ষ। তার মানে মাত্র ক’বছর আগে এই বাকল্যান্ড বাঁধ আপনার আমার সকলের অর্থাৎ ঢাকা শহরের নাগরিকদের নিজেদের সম্পত্তি ছিল। সেই সম্পত্তি কোন সময়, কেনো এবং কেমন করে I.W.T.A-র নিকট হস্তান্তরিত হয়ে গেল, আপনারা এ খবর রাখেন? বোধ হয় না।
তৎকালীন পৌরসভার সদস্য জনাব আহমদ উল্লার বয়ানীতে শুনুন। এই হস্তান্তরের কাজটি বড় সহজে সম্পন্ন হয় নি। এজন্য বেশ কিছু কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। সরকার আর পৌরসভার মধ্যে এই নিয়ে বছর দুই ধরে রীতিমত টাগ-অব-ওয়ার চলেছে। পৌরসভা তার এতোদিনের এই অধিকার বড় সহজে ছেড়ে দেয় নি।
১৯৬৩ সালের কথা। বিনামেঘে বজ্রাঘাত বলে একটা কথা আছে না? ঠিক তাই। পৌরসভা হঠাৎ একদিন সরকারের কাছ থেকে নির্দেশ পেলেন যে, এই বাকল্যান্ড বাঁধটিকে তাঁদের আভ্যন্তরীণ পানি পরিবহণ কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এর কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছিল I.W.T.A ঢাকার বুড়ীগঙ্গার ঘাটকে একটি পোর্টে পরিণত করব। এই পোর্ট গড়ে তোলা হলে প্রদেশের দূর দূর অঞ্চলের যাত্রীদের আসা-যাওয়া এবং মাল চলাচলের ব্যাপারে প্রচুর সুবিধা হবে। ফলে ঢাকা শহরের আয় যথেষ্ট পরিমাণ বেড়ে যাবে, তার মর্যাদাও বাড়বে।
এই নির্দেশ পাওয়ার ফলে পৌরসভার সদস্যদের মধ্যে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি হয়ে গেল। সবাই উত্তেজিত। বাকল্যান্ড বাঁধ ঢাকা শহরের সর্বসাধারণের সম্পত্তি। এর পিছনে দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য। শহরের নাগরিকেরা এক শতাব্দীকালেরও আগে থেকে এ অধিকার ভোগ করে আসছে। সরকার এখন সেই অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছেন—উত্তেজনার কারণ আছে বই কি।
এই বাকল্যান্ড বাঁধের জন্ম হয় ১৮৬০ সালে—সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হবার তিন বছর পরে। তার আগে নদীর পাড় সমতল না থাকায় এবং নানা লোকের মালিকানার জমি থাকায় সর্বসাধারণের বেড়াবার সুযোগ ছিল না। শহরের গা ঘেঁষে নদী থাকবে, কিন্তু সেই নদীর ধারে বেড়ানো যাবে না এটা কি কম দুঃখের কথা! হিন্দু-মুসলমান ভ্রমণার্থীরা এই নিয়ে প্রায়ই জল্পনা-কল্পনা করত। অবশেষে শুধু জল্পনা-কল্পনা নয়, তারা একটা সংকল্প নিয়ে কাজে নামল। হিন্দু আর মুসলমান, উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগী ও উৎসাহী যারা, তাঁরা দল বেঁধে নদীর ধারের জমিগুলি যাদের, তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে ধন্না দিতে শুরু করলেন। চাঁদার খাতা নিয়ে নয়। তাঁদের আবেদন—বিচিত্র এক আবেদন—এই জমির মালিকদের সবাইকে কিছু কিছু নদী সংলগ্ন জমি ছেড়ে দিতে হবে।
কেনো, কি হবে জমি দিয়ে? তাঁরা বললেন, তাঁরা নদীর ধার দিয়ে লম্বা একটা পাকা রাস্তা তৈরী করবেন। সেই রাস্তা দিয়ে সকাল-বিকাল দুবেলা বেড়ানো যাবো।
প্রথমে কাউকে কাউকে বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। পরে ক্রমে ক্রমে সকলেই তাঁদের এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেল। বলল, বেশ তো, নদীর ধারে উঁচু বাঁধা রাস্তা যদি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments