বাঙালির আত্মপরিচয়

মধ্যযুগের বাংলা সংস্কৃতি দীর্ঘ ইতিহাসের প্রান্তে এসে হারিয়ে ফেলেছিল তার প্রাণশক্তি। কারণ সে-সংস্কৃতিতে অখণ্ডতা ছিল হয়তো কোনো-একরকম, কিন্তু ছিল না বিস্তার ও বৈচিত্র্য, টিকে থাকার জন্য যা খুব জরুরি। উনিশ শতকের জাগরণ যাকে বলি, সেই ঘটনা মুক্তি এনে দিল বাঙালিকে তার সেই বদ্ধতা থেকে। এসে গেল আত্মবিস্তারের ও আত্মবিকাশের সুযোগ। বাঙালি আর শুধুই বাঙালি নয়, সে ভারতবাসী এবং কখনো-কখনো বিশ্ববাসী, আন্তর্জাতিক। রামমোহন রায় পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাদের বেদান্তের ভারতবর্ষের সঙ্গে, আরবি তর্ক-বিজ্ঞানের সঙ্গে, সুফি প্রেমসাধনা ও খ্রিস্টীয় জীবনতত্ত্বের সঙ্গে। স্পেনের স্বাধীনতালাভে উল্লসিত ও নেপল্স-এর পরাধীনতায় মর্মাহত এই মনীষীই দিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রথম শিক্ষা। ডিরোজিও ও তাঁর শিষ্যরা তো বিস্তারের সেই সীমাকে আরও বাড়িয়েই গেলেন। বিদ্যাসাগরের কাছ থেকে পেলাম সমাজসচেতনতা, যুক্তিবাদ, ক্লাসিক সাহিত্য-প্রীতি ও মানবিক বোধের নতুন-নতুন অনুভব এবং তা ঘটতে পেরেছিল এই নতুন যুগেই। মাইকেল মধুসূদনের কাছ থেকে বাঙালি এপিকের, আধুনিক কাব্যবোধের নতুন সংজ্ঞা। অক্ষয়কুমার দত্ত খুলে দিলেন ইওরোপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের দরজা। এমনিভাবেই পেলাম রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র দত্ত-কে, আরও অনেককেই। সমাজসংস্কার, ধর্মসংস্কার ও জাতীয়তার উন্মেষের মধ্য দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম অন্য-এক পরিচয়ে—শুধু বাঙালি-পরিচয় নয়, আরও এক বিস্তারিত ও শক্তিশালী পরিচয়, যার নাম ভারতীয়তা।

এর গৌরব যেমন তেমনি এর ফাঁকিও জানা নেই তা নয়। সমস্তটাই ঘটেছিল বিদেশী এক শক্তির ঔপনিবেশিক শাসনের ছায়াতলে। তার দায় তো থাকবেই। তাছাড়া, যাকে আমরা জাগরণ বলছি, তা অতি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের। তার বাইরে অগণ্য মানুষের কাছে তা নিতান্তই অলীক। ফলে বিচ্ছিন্নতা ও দূরত্ব ক্রমশই পাকিয়ে উঠেছে ইংরেজ-প্রবর্তিত শিক্ষার সুবিধা পাওয়া অল্প-কিছু সৌভাগ্যবানদের সঙ্গে বাকি আপামর হতভাগ্য মানুষজনের। উপরন্তু, হয়তো এসব কারণেই, এই জাগরণের নায়ক যারা তাদের মধ্যেও সত্য হয়ে উঠেছে অনেক দ্বিধা, পিছুটান, স্ববিরোধিতা ও সীমাবদ্ধতা।

এ সবই আমরা জানি এবং কম-বেশি মানি। কিন্তু আপাতত যেটা ভাববার, তা হল, ভারতীয়তার এই গৌরবময় এবং প্রয়োজনীয় আত্মবিস্তারে কি সে-সময়ে কিছুটা অনিবার্যভাবেই দুর্বল হয়ে গেল না বাঙালি আত্মপরিচয়ের ভিত? সবটা নিশ্চয়ই নয়। আমাদের মনে আছে রামমোহন রায় লিখেছিলেন 'গৌড়ীয় ব্যাকরণ', বিদ্যাসাগর তাঁর 'কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য' ছদ্মনামে এবং মাইকেল স্বনামে লিখেছিলেন খাঁটি বাংলা বাগুঙ্গির গদ্য এবং প্রহসন। তাছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতা, টেকচাঁদ বা হুতোমের গদ্য, দীনবন্ধু মিত্রের নাটক—এ সবই অল্পবিস্তর আমাদের সংশয়কে দূর করতে পারে হয়তো। তবু, মানতেই হয়, জোরটা পড়েছিল, খুব সংগতভাবে, ভারতীয়তার চর্চার দিকেই। কারণ, আমরা আগেই দেখেছি, আত্মবিস্তারের তাগিদটাই ছিল নব্যশিক্ষিত বাঙালির সময়োচিত অভিজ্ঞতা।

নিকটতর প্রত্যক্ষ বাস্তব বিষয়ে উদাসীনতা বা দ্বৈতের চমৎকার উদাহরণ বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর চিন্তাজগতে একদা পশ্চিমী হিতবাদী দার্শনিকেরা ছিলেন, শেষ জীবনে সর্বভারতীয় গীতা। পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা শাখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বাঙালি পঠককে। তবু 'বঙ্গদেশের কৃষক' বা 'বাঙ্গালার ইতিহাস' সত্ত্বেও বলতেই হয়, কী উপন্যাসে কী প্রবন্ধে প্রত্যক্ষ বাস্তবে তাঁর অল্পই মনোযোগ। বরং তাঁকে ঘিরে যে গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় 'মজলিশ', তাঁদের মধ্যে কেউ-কেউ, যেমন অক্ষয়চন্দ্র সরকার বা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ছিলেন অনেক মাটির কাছাকাছি। বঙ্কিমশিষ্য হরপ্রসাদই অকপটে বলেছিলেন, ‘তাঁহার [বঙ্কিমচন্দ্রের] কাব্যের গণ্ডী কিন্তু বাংলায় আবদ্ধ নহে তাঁহার কাব্যের ক্ষেত্রও ভারতময়। তিনি লিখতেন বাংলায়, কিন্তু তাঁহার আকাঙ্ক্ষা ছিল ভারতের কবি হইবেন, সব জাতির কবি হইবেন।... তাঁহার প্রধান চেলা অক্ষয়বাবু কিন্তু বাংলার বাহিরে একেবারে যাইতে চাহিতেন না। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে ভালো করিয়া চেনা। তাই তিনি খুঁটিনাটি করিয়া বাংলার সব জিনিশ দেখিতে চাহিতেন। বঙ্কিমবাবু খুঁটিনাটি করিয়া দেখিতে চাহিতেন না। তিনি বড়ো বড়ো জিনিশগুলিই দেখিতেন; ভালো ও বড়ো জিনিশগুলিই দেখিতে চাহিতেন, বাছিয়া লইতেন। তাই তাঁহার বইয়ে দুঃখী গরিবের

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice