অকল্পিত
একটি মাত্র হলে এত পরিচ্ছদ, এত শাড়ির বৈচিত্র্য, তবু গুঞ্জন কোলাহল হইয়া ওঠে নাই, আর হয়ও না। কারণ, যে সমাবেশ, যে পরিবেশ—এখানকার বাতাসে যে সুরুচির সৌরভ, জীবনের বিশেষ অভিব্যক্তি।
মিসেস ঘোষ সমুদ্রপারের মেয়ে, আরও অনেক ইংরেজ মেয়ের মতোই একটি বাঙালি ছেলেকে বিবাহ করিয়া আজ বছর দশেক হয় কলিকাতায়, অর্থাৎ ভারতবর্ষের আকাশের নীচে। বিদেশী এই বিহঙ্গীর বয়স হইয়াছে, কিন্তু চেহারার জৌলুস এতটুকু কমে নাই। বিশেষ করিয়া হাসিটি—বরফের কুচির মতো দাঁতগুলি কী সুন্দর চকচক করিয়া ওঠে। যাই বল, ঘোষ লোকটি ভাগ্যবান, পত্নী-ভাগ্যে ভাগ্যবান। সেই মিসেস ঘোষ আজ এখানে আগত কয়েকটি স্বজাতির সঙ্গে একেবারে মিশিয়া গিয়াছেন। হয়তো ওই প্যাটার্সন লোকটির গা ঘেঁষিয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া লন্ডনের রাজপথের অনেক তুষার-ভেজা সকালের কথা, বা গ্রীষ্মকালের সমুদ্রস্নান, তীরবর্তী বালুর আঘ্রাণ, অথবা কলেজ বিল্ডিং-এর করিডোরে একদিনের চপলতায় নিঃশঙ্ক আচরণ ও বিচরণের কথা মনে হইতেছে।
বাহিরে মোটরের ভিড় বাড়িয়া চলিয়াছে। শিল্পী জীবানন্দ সেন একা মানুষ, কারের হুশ হুশ আর জুতার মচ মচ আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত এবং ব্যস্ত হইয়া আসেন অভ্যর্থনা করিতে। নিঃসঙ্গতা হেতু এই ভয়, তাহার চারিদিকে দৃষ্টি না দেওয়ার ফলে যদি কোনো সম্ভ্রান্ত অতিথি অভ্যর্থনার উষ্ণতা হইতে বাদ পড়িয়া যান।
এটর্নি অতুল সরকার একটি বধূর ছবি দেখিয়া আশ্চর্য হন, পাশে জীবানন্দের দিকে চাহিয়া বলিলেন, ‘বাঃ চমৎকার! জীবানন্দবাবু, শুধু এই ছবিখানা দিয়েই আপনাকে পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পীরূপে অভিহিত করা যায়; সত্যি, চমৎকার!’ জীবানন্দ মুচকি হাসেন। এটর্নি সাহেবের সময় নাই, তাড়াতাড়ি সারিতে হইবে, চারিদিকে একবার দৃষ্টি বুলাইয়া পাশে অগ্রসর হন।
আর একটি মেয়ে—যে মেয়েটির আঘ্রাণ পাইয়া নেহাত আত্মাভিমানী কোনো মেয়েরও চোখে তাক লাগিবে, তির্যক দৃষ্টিতে একবার অন্তত সেদিকে চাহিবে—সেই মেয়েটি, অনেকেই জানে, ব্যারিস্টার প্রতুল চক্রবর্তীর কন্যা। অপরূপ রূপবতী (নেহাত আত্মাভিমানী কোনো মেয়েও একথা বলিবে)। গায়ের রং এত ফর্সা যে ঠোঁটের নকল রং-ও সৌন্দর্যে তীব্র হইয়া উঠিয়াছে। মাথার চুল কপালের পাশে ঈষৎ কোঁকড়ানো, কালো কুচকুচ। মসৃণ, নগ্ন দুই হাতে চুড়ির ভার অল্প, পরনের শাড়িতে আগুন জ্বলে, লাল।
প্রফেসর সুব্রত রায়ের বয়স অল্প, ছেলেরা তাহার সঙ্গে ইয়ার্কি দেয়, তাহার সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে, এমনকী তাহার ব্যক্তিগত জীবনেও দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়াছে। অবশ্য সুব্রতর সেখানে অসম্মতি ছিল না, সে বলে: কেবল পড়ার সময় পড়া, অন্য সময় আমরা বন্ধুর মতো ব্যবহার যেন করি। কিন্তু ভাগ্যিস এখানে কোনো ছেলেই আসে নাই। তাহার পরনে ছাই রঙের স্যুট, চুলগুলি ব্যাক-ব্রাশ করা, কতকটা লালচে রং ধরিয়াছে।
তাড়াতাড়ি অগ্রসর হইয়া বলিল, ‘মিস চক্রবর্তী?’ পাশে চাহিয়া শকুন্তলা হাসিয়া ফেলিল—‘আপনি?’ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া সুব্রত বলিল, ‘ওই দিকটাতে একটা ছবি ছিল, সেটাকে আমার মতে শ্রেষ্ঠ বলা চলে—দেখেছেন?’ ত্রস্তভাবে কথা বলা শকুন্তলার অভ্যাস। বলিল, ‘আমি তো সব ছবিই দেখেছি, কোন্টা বলুন তো?’
—‘সে একখানা পোরট্রেট।’ শকুন্তলার গা ঘেঁষিয়া সেই ছবিটির দিকে যাইতে যাইতে সুব্রত বলিল। প্রথমে চারিদিকে একবার যথাসম্ভব সুন্দর ভঙ্গিতে তাকাইয়া তারপর শকুন্তলা ছবির দিকে দৃষ্টি দিল, তীক্ষè দৃষ্টিতে কতক্ষণ দেখিয়া বলিয়া উঠিল, ‘শ্রেষ্ঠ একে বলা চলে না, রয়, আপনার বিচারকে তারিফ করতে পারিনে।’
সুব্রত হাসিয়া বলিল, ‘তাই নাকি!’ তাহার চোখে চোখে চাহিয়া শকুন্তলা বলিল, ছবিটার দিকে একবার চেয়ে দেখুন। যে অঙ্কন-পদ্ধতিতে জীবানন্দ এই ছবিটা এঁকেছেন, সেই ধরনের অনেকগুলো ছবি তাঁর আছে। এই দেখুন না, এটাও। এগুলোই নাকি তাঁর আজকালকার আঁকা—আমার কিন্তু ভালো লাগে না। তবে এখানকার কিছু সইতে পারি, বেশ ভালোই এটা কিন্তু তাবলে শ্রেষ্ঠ নয়।’
—‘সেই হিসেবে দেখতে গেলে অবিশ্যি আপনার কথাই ঠিক, হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন...।’ টানিয়া
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments