বাঘের মন্তর
বাইরে বেশ শীত সেদিন। রায়বাহাদুরের বাড়ির বৈঠকখানায় বসে বেশ গল্প জমেছিল। আমরা অনেকে ছিলাম। ঘন ঘন গরম চা ও ফুলুরি-মুড়ি আসাতে আসর একেবারে সরগরম হয়ে উঠেছিল।
রায়বাহাদুর অনুকূল মিত্র একজন মস্ত বড়ো শিকারি। আমরা কে তাঁর কথা না শুনেছি? তাঁর ঘরে ঢুকে চারিদিকে চেয়ে শুধু দেখবে— মরা বাঘ ও ভালুকের চামড়া, বাঘের মুখ, ভালুকের মুখ বাঁধানো; ঘরগুলো দেখে মনে হয়— ট্যাক্সিডারমিস্টের কারখানায় বুঝি এসে পড়লাম।
কিন্তু সেদিন আর-একজন লম্বা মতো প্রৌঢ় ব্যক্তিকে রায়বাহাদুরের অতিকাছে বসে থাকতে দেখে ও শিকার সম্বন্ধে দু-একটি কথা বলতে শুনে বেশ অবাক হয়ে গেলাম। রায়বাহাদুরের সামনে শিকারের কথা বলে এমন লোক তো আজও দেখিনি! যে অনুকূল মিত্র জীবনে ত্রিশটি রয়েল বেঙ্গল, পনেরোটি লেপার্ড মেরেছেন, ভালুক ও বুনো শুয়োরের তো লেখাজোখা নেই। এ ছাড়া আছে গণ্ডার, আছে বাইসন, আছে অজগর-পাইথন, আছে শজারু, আছে কাক বক হাঁস, এ-হেন রায়বাহাদুরের পাশে বসে শিকারের কথা বলা! নাঃ, লোকটা কে হে? বড়ো কৌতূহল হল জানবার।
উপেনবাবু, আমাদের উপেন মাইতি আপন মনে চা খেয়েই চলেছেন, তাঁকে দেখে বললাম— ও উপেনবাবু, ওই লোকটি কে?
উপেনবাবু যেন হঠাৎ ভয় পেয়ে বলে উঠলেন— অ্যাঁ? কই, কে?
—ঘাবড়াবেন না। ওই আধ-বুড়ো লোকটি কে?
—উনি?
—হুঁ, বলুন না।
—বিজ্ঞ-শিকারি নিধিরাম ভট্টাচার্য।
—নামটা যেন নৈয়ায়িক পণ্ডিতের মতো শোনালো। আপনি অনায়াসে বলতে পারতেন— নৈয়ায়িক নিধিরাম সার্বভৌম।
—তা, শিকারের ব্যাপারে উনি নিতান্ত কেউকেটা নন! ওঁর ‘শিকার-যোগ’ বই পড়েননি? তিনটে এডিশন হয়ে গেল। আসুন আলাপ করিয়ে দিই।
আমার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। নিধিরাম ভট্টাচার্য যে কোনোকালে চাল-কলা বাঁধা পুরুত ছিলেন না, তা তাঁর কথাবার্তার ধরনে আগেই বুঝেছিলাম; এখন সেটা আরও ভালো করে জানা গেল। নানা স্থানের বাঘ-ভাল্লুকের শিকার কীভাবে হয় সে গল্প করলেন। রাত্রে কীভাবে গাছের উপর বসে কাটিয়েছেন, কোন জঙ্গলে একবার বাঘের মুখে পড়েছিলেন, ইত্যাদি নানা গল্প। লোকটি ভালো গল্প বলতে পারেন। এমন সুন্দর, নিখুঁতভাবে গল্প বলছিলেন যে, আমরা ঘটনাবলি যেন চোখের ওপর ঘটতে দেখছি। আরও দেখলাম, নিধিরাম বেশ প্রকৃতি-রসিক ব্যক্তি। জ্যোৎস্না রাত্রি ও বর্ষামুখর শ্রাবণ রাত্রিগুলির এমন সুন্দর বর্ণনা দিচ্ছিলেন মুখে মুখে! আমি বললাম— একটা কিছু আশ্চর্য ঘটনা বলুন।
নিধিরাম ভটচাজ বললেন— সবই আশ্চর্য। বনের সব ব্যাপারই আশ্চর্য।
—তবুও।
—তবুও কী? ভূত দেখিনি কখনো চোখে।
—বিশ্বাস করেন?
—না।
বা-রে, এ-আবার অতি অদ্ভুত লোক। বাঙালি হয়ে ভূতে বিশ্বাস করে না, এমন লোক তো দেখিনি! পরে কথার ভাবে বুঝলাম তিনি তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাসী। বললাম— আপনাদের তন্ত্রশাস্ত্রে ভূত মানে না?
—তন্ত্রশাস্ত্র আমি পড়িনি। মন্তর-তন্তরের কথা বলছি।
—ও! কীরকম মন্তর-তন্তরের?
—সব বাজে, ভুয়ো।
—ও-ও বাজে?
—একদম।
—আমি একেবারে অতটা যেতে রাজি নই। মন্তরের শক্তি নিশ্চয় আছে।
—ওই করে করে দেশটা উচ্ছন্নে গেল। আপনারা ইংরেজি লেখাপড়া শিখেও এইসব মানেন?
এইবার নিধিরাম ভটচাজের ওপর আমার শ্রদ্ধা হল। আশ্চর্য মানুষ তো? আধুনিক মনোবৃত্তিসম্পন্ন প্রৌঢ় ব্যক্তি। আমি বললাম— সুন্দরবনে আপনি গিয়েছেন?
—অনেকবার। এই মন্তর-তন্তর সম্বন্ধে সেখানকার একটি ঘটনা বলি।
আমি বেশ এগিয়ে গিয়ে বসলাম তাঁর কাছে। দিনটা এইসব গল্প শুনবার উপযুক্ত বটে। উনি বলতে লাগলেন —
সেবার কাকডাঙার ট্যাঁকে আমাদের বজরা লেগেছিল। আমাদের যিনি শিকারের গুরু, খুলনার উকিল সীতাকান্ত রায়ের ভাইপো শ্যামাচরণ রায় ছিলেন আমাদের সঙ্গে। কথাটা উলটো বলা হল। আসলে তাঁর সঙ্গেই আমরা গিয়েছিলাম; নইলে আমাদের অবস্থার লোক আর বজরা কোথায় পাবে বলুন!
যেখানে বজরা বাঁধা হল সেখানটা একটা খালের মুখ। গভীর বনের মধ্যে দিয়ে এসে এখানে নদীতে পড়েছে কাকডাঙার খাল। খালের দৃশ্য বড়ো সুন্দর। দু-ধারে হেঁতাল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments