যুদ্ধজয়ের আনন্দ: একটি দিনের স্মৃতি
লেখক: ধীরাজ কুমার নাথ
১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর। সকাল থেকে মাননীয় মন্ত্রী শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের বাসায় একান্ত সচিব হিসেবে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। এক পর্যায়ে বললাম, স্যার আজ কিন্তু আমি ১২টার পরই চলে যাবো, প্রতিদিনের মতো রাত অবধি থাকবো না। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, কেন আজ কী হলো? আমি বললাম মিছিলের পর মিছিল যাচ্ছে কোলকাতার ময়দানের (গড়ের মাঠ) দিকে, লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হবে। সবার মুখে এক কথা আজ ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিবে। মিছিলের কিছু স্লোগানে এমন দাবী আমি শুনেছি। আমি এই ঐতিহাসিক ঘোষণা নিজ কানে শুনতে চাই। আজ অনেক বাংলাদেশি সেখানে হাজির হবে, বিশেষ করে সল্ট লেইকে আশ্রয়গ্রহণকারী প্রায় সকল শরণার্থী এই মিছিলে থাকবে এবং তারা অতি জোরে এই দাবী করবে, কারণ এটা হচ্ছে তাদের জীবন মরণের লড়াই। মন্ত্রী মহোদয় একটু হাসলেন এবং বললেন আমাকে কাল জানাবেন কী শুনেছেন। আমি বললাম, আমার জানাতে হবে না স্যার, সব বিশ্ববাসী তৎক্ষণাৎ জেনে যাবে, আপনি জানবেন আরো আগে। রেডিওটি কাছে রাখবেন।
প্রসঙ্গত বলতে হয়, মন্ত্রী মহোদয় থাকতেন কলকাতার সিআইটি রোডের, ৩৯ ড. সুন্দরী মোহন এ্যভেনিউতে। বিল্ডিং-এর নাম চম্পা কোর্ট। মালিক আশু ঘোষ। এটি একটি ঐতিহাসিক বিল্ডিং। কলকাতা শহরের অনেকেই এই বিল্ডিং চেনেন। এই বিল্ডিং এর বিভিন্ন তলায় থাকতেন মন্ত্রি সভার সদস্যবৃন্দ। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী এম মুনসুর আলী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং ২৫নং ফ্ল্যাটেই থাকতেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ এর পরিবারবর্গ। প্রধানমন্ত্রী থাকতেন ৮নং থিয়েটার রোড়ে। তিনি স্বাধীনতা না হওয়া অবধি পরিবারের সঙ্গে থাকবেন না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। এই বিল্ডিং এর ছয় তলায় ছিল শহীদ এ এইচ এম কামরুজ্জামান সাহেবের বাসা। আমি মন্ত্রী মহোদয়ের বাসায় অফিস করতাম। ছোট বাসা, কোনো প্রকারে ড্রয়িং রুমে বসে জনগণের আবেদন, কর্মসূচি প্রণয়ন, ভ্রমণসূচি সমন্বয় করা ইত্যাদি কাজ করতাম।
তাড়াতাড়ি রাস্তায় বের হলাম ময়দানে যাবো বলে। রাস্তাঘাটে বাস চলাচল কমে এসেছে, সকল রাস্তা আজ ময়দানে গিয়ে মিশেছে। আমার ভাগ্য ভালো একটি বাস পেয়ে গেলাম যেটি পার্ক স্ট্রিট হতে ঘুরে ফিরে ময়দানের কাছ দিয়ে যাবে। সম্ভবত, এদিকে বেশি যাত্রী দেখে একটু ঘুরে যাবে। আমি পৌঁছে গেলাম ময়দানে প্রায় ৩টায়। বিশাল জনসমুদ্র। শত শত মাইক লাগিয়েছে কিন্তু ভালো কিছুই শোনার উপায় নেই। মুখ্যমন্ত্রী শ্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় বক্তব্য দিচ্ছেন এবং সবাইকে শৃঙ্খলা রক্ষা করে বসে থাকতে অনুরোধ করলেন। আমি ঠিক করলাম মাঠের পশ্চিম ধার দিয়ে শ্রীমতি গান্ধী মাঠে প্রবেশ করবেন, আমি সেখানে গিয়ে দাঁড়াবো যেন সরাসরি দেখতে পাই। ভাগ্য আর কাকে বলে, আমার সিদ্ধান্ত সঠিক হলো। যথা সময়ে দেখলাম মোটর ক্রেড বহরের চলাচল। ক্ষণিকের মধ্যেই দেখলাম, শ্রীমতি গান্ধী একটি খোলা জীপে করে দু'হাত জোড় করে ধীরগতিতে ময়দানের দিকে আসছেন। অস্তগামী শীতের বিকালে পশ্চিম আকাশের সিঁদুরে রং শ্রী মতি গান্ধীর মুখে এসে পড়েছে। হাত জোড় করে যেন একটা প্রতিমা এগিয়ে চলেছেন সামনের দিকে। অপূর্ব এক দৃশ্য, আমি বিমোহিত হলাম।
আমি অনেক কাছে যেতে পেরেছি এবং প্রায় বিশ হাত দূর থেকে পরিষ্কারভাবে শ্রীমতি গান্ধীকে দেখতে পেয়ে হাত জোড় করে প্রণাম জানালাম, সে এক অনুভূতি। তারপর তিনি চলে গেলেন পেভেলিয়ানের দিকে। প্রচণ্ড স্লোগান, লক্ষ লক্ষ লোকের শব্দাশব্দি। আমি ঠিক করলাম এখানে দাঁড়িয়ে কিছুই শুনতে পাবো না, চলে যাই বেহালার আমার আশ্রয় স্থলে, সেখানে গিয়ে রেডিওতে সব শুনবো। ১৯৭১ সালে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বর্তমানের মতো ছিল না তাই তিনি দু'হাত জোড় করে খোলা জীপে দেশবাসীকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এবং জনতা গভীর আনন্দে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments