সেকালের ঢাকার বিনোদন
দেশভাগের পর কলকাতার পাট ঢুকিয়ে যখন এক রত্তি ঢাকায় এলাম, তখন ব্রিটিশ-উত্তর যুগের সেই বাঘাহামা কালে বিনোদনের জায়গা বলতে ছিল ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ছটা প্রেক্ষাগৃহ রমনার রম্ভা 'ব্রিটানিয়া', সং বংশালের 'মানসী', কাচারি পল্লীর 'মুকুল', সদরের শোভা 'রূপমহল', উর্বশীসম 'লায়ন', চর্মে ঘর্ম আর্মেনিটোলার 'নিউ পিকচার হাউস', আর চকের চাকু 'তাজমহল'। পরে পঞ্চাশের দশকের মধ্যে গড়ে ওঠে মায়া (বর্তমানে স্টার), নিউ প্যারাডাইজ (অধুনালুপ্ত), গুলিস্তান, নাজ ও নাগরমহল (বর্তমানে চিত্রামহল)। কোনো নাট্যশালা নয়, কোনো চিড়িয়াখানা নয়, ভালো পার্ক নয়, সাংবৎসরিক সার্কাস নয়-কিছু না। তবে অপার সবুজের স্নেহসান্নিধ্য পেতে ছিল কিন্তু নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর বলধা গার্ডেনের আশ্চর্য সব তরুলতা ও বৃক্ষেরা-রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ক্যামেলিয়া থেকে শুরু করে শঙ্খনিধির কানায় কানায় বুকভরা জলে নলিনীসকলসহ আমাজন লিলিরা ছিল তো। ছিল গোটা রমনার অনন্ত সবুজ।
বলতে ভুলেছি, বিনোদনের আরেকটা জায়গা ছিল-রমনার রেসকোর্স-ঘোড়দৌড়ের মাঠ-আজ যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। কিন্তু বালকের এলাকা নয় মোটে ওটা, নয় আমাদের সুশীল রক্ষণশীল সমাজের। কারণ একটাই, ওটাকে বলা যাবে না পুরো সুস্থ প্রমোদ। প্রতিযোগিতার দৌড় জয়পরাজয়ের রোমাঞ্চ হয়তো ছিল, কিন্তু ওর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা ছিল জুয়োর উন্মাদনা। আপনারা বলবেন, ওই কালে ওই একটা জুয়োর কথা বলছেন, অথচ যে বুদ্ধিজীবীদের আখড়া প্রেসক্লাব, বেনিয়া ও আমলাদের ঢাকা ক্লাব ও অফিসার্স ক্লাব, এবং ফুটবল ক্লাবগুলোতে তিন তাস ও হাওজির যে সর্বনাশা খেলা চলছে, সেটার বেলায়? তুলনায় ফি হপ্তাহে পান্টার গুনতে হয় তুলনামূলকভাবে কম। তবে পান্টারদের মতো বাজি না ধরেও ফার্লঙের হিসেব কষে ঘোড়ার বেগের সঙ্গে মনের আবেগের যোগ হতে কোনো মানা ছিল না। যত দূর মনে পড়ে ফি শনিবার রেস হতো। ঘোড়ারোগ যাদের পেয়ে বসেছে, পুরান ঢাকার সেই বনেদি পান্টারেরা সকাল থেকেই পিল পিল করে জুটত রেসকোর্সে। এখন যেখানে পুলিশদের আড্ডা ঘরবাড়ি, ওগুলো ছিল ঢাকা রেস ক্লাবের প্রশাসনিক ভবন ও টিকিট ঘর। সামনেই ছিল দর্শকদের গ্যালারি। এদিন কান্দুপট্টি, সাঁচিবন্দর, কুমোরটুলির হট্টবিলাসিনীদেরও দেখা মিলত এই ভিড়ে-কেউ রিকশায় ভেড়োর হাত ধরে, অনেকে ঘোড়ার গাড়িতে দলবেঁধে। সাধারণ পান্টারদের সঙ্গে রেলিং ঘেঁষে এক ঠায় দাঁড়িয়ে সারা হপ্তা অন্যদের আনন্দ বিলিয়ে নিজেরা আনন্দ লুটত দেহবল্লরীতে ঢেউ তুলে, হরষে পুলকে নিজেদের উজোড় করে দিয়ে। সমাজপতি, বিত্তবান ও ক্লাবের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত হোয়াইট গ্যালারিতে তখন আড়চোখের চালাচালি। এই গ্যালারির একজন নিয়মিত সদস্য ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর-খেলাটা যেমন বুঝতেন, উপভোগ করতেন ততোধিক। ওদিকে বুকিরা ছোটাছুটি করছে রেসপিটস্-এর বই হাতে। কেউ কেউ একবার ঘুরে আসছে ঘোড়াশালে-ওই যেখানে আজ বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্রাবাসগুলো গজিয়ে উঠেছে, ইকবাল হলের পেছনে ছিল তো মোগল আমলের বিশাল বৃত্তাকার ঘোড়ার আস্তাবল। বুকিদের কথার সঙ্গে, টিপস বইয়ের মিল না বেমিল একবার দেখতে হয়তো-ঘোড়ারা সব ঠিকঠাক? হ্রেষারব কী বলে? পা ঠুকঠুকানি লেজ নাড়ানি? খাওয়াদাওয়া, জাবর কাটা-সব নরমাল? জ্বলজ্বলে রঙের জার্সি গায়ে জকিরা তৈরি হচ্ছে মাঠে যাবে বলে। না, কোনো কথা কি ইশারা নয়, কোনো টিপস নয়-পাক্কা নিষেধ আছে ক্লাবের বিধানে। আহা, ঘোড়াগুলোর কী বাহারে সব নাম: ফ্লাইং কুইন, রোজ অব ঢাকা, ভিক্টোরিয়া রেজিনা, বিউটি কুইন, ঢাকা থান্ডার। টিকিট ঘর খুলতেই পান্টারদের মধ্যে হুটোপুটি!
ঘোড়া ছুটছে, এক এক ফার্লং পেরোচ্ছে আর দর্শকদের হল্লা বাড়ছে, পিছিয়ে-পড়া জকির নামে খিস্তিও অনুপাতে কম জুটছে না। মফস্বলের ঘ্রাণমাখা রাজধানীর সুশীল আকাশবাতাস মুহুর্মুহু গর্জনে কেঁপে কেঁপে উঠছে। কলকাতায় গড়ের মাঠে বাবাদের আপিসের কোনো ফুটবল ম্যাচ থাকলে, কিংবা লিগের কোনো বড় ম্যাচ-তখন দূর থেকে ভেসে আসা রয়েল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের ঘোড়দৌড়ের চিৎকার শুনেছি; কিন্তু কখনো কাছে থেকে দেখিনি। এখন একেবারে সুমুখ থেকে।
বিকেলে খেলা সাঙ্গ হলে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments