চল্লিশ দশকের ঢাকা
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে ঢাকার রাজনৈতিক জগতের মানচিত্রটা বদলে যায় অনেক। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানব সভ্যতার গতিধারাকে প্রবাহিত করে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মপ্রকাশ ভারতের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে যায়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের অভূতপূর্ব পদক্ষেপ, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ কোন্দল এসব তো ছিলই। ’৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ভারতীয় বিপ্লবীদের মেরুদণ্ডকে অনেকখানি শক্ত করে দিয়েছিল কেবল নয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বুকে ভীতির কম্পন জাগিয়েছিল। তাছাড়া বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সংকট ভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে যায়। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু গঠন করেন সর্বভারতীয় ফরোয়ার্ড ব্লক। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন সংগঠন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতে নতুন দিগন্তের সূচনা করে। ফ্যাসিস্ট শক্তির উন্মেষ ভারতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। যা থেকে ঢাকা মুক্ত ছিল না। সে সময়কার দুটি স্মরণীয় মানুষের স্মৃতিচারণ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত হল।
সরদার ফজলুল করিম:১৯৪০-এর পরবর্তীকাল যুদ্ধ বেধে গেছে ইউরোপে। সে যুদ্ধ ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে বিশ্বের চারদিকে। ’৪২-এর গোড়াতে এশিয়াতে যুদ্ধ চলছে। জাপান এগুচ্ছে চীনের দিকে এবং বর্মার দিকে। ভারতবর্ষে প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছে। প্রধান ধারার বাইরে মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ জিন্নাহ সাহেবের নেতৃত্বে দাবি তুলেছে পাকিস্তানের। ’৪০-এর মার্চে লাহোরে পাশ হয়েছে পাকিস্তান প্রস্তাব। মুসলিম সমাজের ছাত্রদের মধ্যেও পাকিস্তান আন্দোলন সাড়া জাগাচ্ছে। মুসলিম ছাত্রদের প্রতিষ্ঠান এই আন্দোলন সমর্থন করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলমান ছাত্রগণ বোধহয় এই প্রথম দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক মঞ্চের ঘটনা-দুর্ঘটনা, দাবি প্রতি দাবির প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তাদের মধ্যে। তারা আন্দোলিত হচ্ছে তার দ্বারা।
“বঙ্গদেশ এবং তার রাজধানী কলকাতায় তখন এই রাজনীতিই নানা জটিলতা লাভ করছে। বঙ্গদেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি এতদিন মুসলিমদের অন্যতম প্রতিষ্ঠান মুসলিম লিগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু জিন্নাহ সাহেবের সঙ্গে তাঁর বিরোধিতা ঘটেছে। তিনি মুসলিম লীগের বাইরের শক্তি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রখ্যাত নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে সঙ্গী করে কলকাতায় আইন পরিষদে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। এই মন্ত্রিসভাকেই মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ এবং অনুসারীগণ নিন্দাসূচকভাবে ‘হক-শ্যামা’ বা ‘শ্যামা- হক’ মন্ত্রিসভা বলে অভিহিত করছে। এই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ঢাকার নওয়াব হাবিবুল্লাহ। পুরাতন ঢাকা তথা ঢাকার স্থানীয় মুসলিম সমাজের পর নওয়াব পরিবারের তখনো বিপুল প্রভাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্ররা প্রধানত ঢাকার বাইরে থেকে আগত। তাদের বাস ছাত্রাবাসগুলোতে। মোটকথা বৃহত্তর ক্ষেত্রে যেমন, ঢাকাতেও তেমনি হক সাহেবের মন্ত্রিসভার পক্ষের, বিপক্ষের একটি রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত হয়ে ওঠে।”
“...১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ, অসামান্য সম্ভাবনার আকর, রেলশ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, তরুণ লেখক সোমেন চন্দ একটি শ্রমিক মিছিল পরিচালনাকালে প্রতিপক্ষীয়দের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। আমি তখন আই এ পরীক্ষা পাশ করে ঢাকা ইউনিভার্সিটির দরজায় মাত্র পা রেখেছি। প্রগতি লেখক সঙ্ঘের সাথে তখনো হয়ত হৃদ্যতা ততো তৈরি হয়নি। সোমেনের নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ঘটনাই হয়ত চুম্বকের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মীদের আকর্ষণ করে নিয়ে গিয়েছিল প্রগতি লেখক সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে, আলোচনায়, ক্রিয়াকর্মে। আমার ভাগ্য যে, আমিও সে আহ্বানের বাইরে সেদিন থাকতে পারিনি।
“১৯৪২ সনের মার্চ মাসে সোমেন চন্দ যখন নিহত হয়, আমাদের মুসলমান ছাত্র সমাজের বৃহত্তর অংশ তখন নিজেদের নেতৃবৃন্দের মান-অপমানের পরিমাণ নির্ধারণ লইয়া ব্যস্ত। কোন বিশিষ্ট নেতাকে পুষ্পমাল্য প্রদান বা অপর কাহাকেও কালো পতাকা প্রদর্শন, ইহাই ছিল আমাদের রাজনীতির তখনকার বৈশিষ্ট্য। আমাদের সেই চেতনাহীন অবস্থাতে সোমেন চন্দের মৃত্যুকে আমরা হয়ত ঠিকভাবে দেখিতে পারি নাই। এমনি সময়ে শুনিয়াছিলাম সোমেনের মৃত্যুর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments