ঢাকায় শেষ দিনগুলি

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়ে নজরুল ইসলাম বাক্‌শক্তিহীন ছিলেন। তার স্বাভাবিক চেতনা ছিল না, তথাপি পূর্ব পাকিস্তানের আমল থেকে কবিকে ঢাকা বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বেসরকারীভাবে কেউ কেউ বলতেন। তখনো সরকারীভাবে ঘোষিত না হলেও তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদার কথা চিন্তা করা হতো। এর বিপরীতে আরেকটি দিক ছিল জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েও তার গান ও কবিতার অঙ্গচ্ছেদ করার চেষ্টা হতো হিন্দুয়ানীর অভিযোগে। এভাবে যথেচ্ছ শব্দ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত কম ছিল না। পাকিস্তান আমলে ‘নওবাহার’ পত্রিকায় নজরুলের সমালোচনায় কবি গোলাম মোস্তফা লিখেছেন: “নজরুলকে পাকিস্তানের জাতীয় কবি বলিয়া অনেকে মনে করেন। কিন্তু নজরুলের সবচেয়ে বড় অপবাদ যদি কিছু থাকে, তবে এই।... পাকিস্তানের কবি হওয়া দূরের কথা, নজরুল ছিলেন ঘোর পাকিস্তান বিরোধী।

তিনি গাহিয়াছিলেন ‘অখণ্ড ভারতের গান’, তিনি দেখিয়াছিলেন হিন্দু মুসলিম কৃষ্টির ‘হরগৌরী রূপ।’ মুসলিম জাতির জন্য তিনি নতুন করিয়া কিছু ভাবেন নাই।... তিনি ছিলেন আগে ভারতবাসী, পরে মুসলমান। মুক্তি আন্দোলন সম্বন্ধে তিনি যত কবিতা ও গান লিখিয়াছেন, সমস্তই ভারতীয় মার্কা।... আপন আপন জাতীয় ঐতিহ্য ও রূপায়ণই তো কবি সাহিত্যিকের ধর্ম। কবি নজরুল ইসলাম এখানে চরম পরাজয় মানিয়াছেন।... ইসলামের আলোকে দেখিলে দেখা যায়, ইসলামের সনাতন আদর্শের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ কথা তার কাব্যে আছে।”

নজরুল ইসলাম দ্বি জাতিতত্ত্ব সমর্থন করতেন না। ‘নবযুগ’ (১৯৬১)-এ তাঁর বিখ্যাত সম্পাদকীয় ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্থান’ রচনায় তার চিন্তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি ধর্মের ভিত্তিতে জাতিতত্ত্ব অবৈজ্ঞানিক মনে করতেন। সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা যায় আমৃত্যু তিনি ভারতীয় থাকতেন। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পবিহাস তাঁর জীবনাবসান হয়েছে ঢাকায় বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে। অবশ্য তাঁর অজ্ঞান অবস্থায় নাগরিকত্বের ছাপটা দেওয়া হয়েছিল। তবে একথা অস্বীকার করা যাবে না যে দেশ ভাগ হলেও রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুলকে ভাগ করা যায়নি। তাঁরা দুই রষ্ট্রেরই জনমনে জাতীয় কবির মর্যাদার আসনে ছিলেন, এখনো আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয় অকল্পনীয রক্তপাতের ভিতর দিয়ে। সেদিন রণসঙ্গীত ছিল নজরুলের গান, প্রেরণা ছিল রবীন্দ্রেব স্বদেশী গানে। পাকিস্তানের প্রভুত্বের শাসন থেকে মুক্ত হবার জন্য বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম ভারতবাসীর পূর্ণ সমর্থন লাভ করেছিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ এই মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের সম্মানজনক স্থান ছিল পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তার অনুবোধে ভারত সরকার কাজী নজরুলকে বাংলাদেশে পাঠাতে রাজী হয়। উদ্দেশ্য ছিল দুই বাংলার মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক রক্ষা করা। সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৯৭২ সালের জন্মোৎসব পালিত হবে বাংলাদেশের ঢাকায়। কবি তার পরিজন সহ একবছর বাংলাদেশে থাকবেন। ১৯৭৩ সালের জন্মদিনে কবি উপস্থিত থাকবেন ভারতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, দেশ ভাগের পরে ১৯৫৭ সালে কবিকে ঢাকায় নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তাব এসেছিল। বুলবুল একাডেমী নজরুল সঙ্গীত সম্মেলন করার আয়োজন করেছিল। প্রস্তাব এসেছিল কবি ও তাঁর পরিবারের লোক এবং কলকাতার বিখ্যাত শিল্পীবৃন্দসহ মোট ১৫ জন ঢাকায় ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভারত সরকার কবি ও প্রমীলাদেবী ছাড়া মোট ২৩ জনের পাশপোর্ট মঞ্জুর করে। সূতবাং বুলবুল একাডেমীর নজরুল সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়। সে সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জহরলাল নেহেরু। পাকিস্তানে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন সি. সি. দেশাই। সম্ভবত তারই রিপোর্টে কাজী নজরুল ও প্রমীলাদেবীর পূর্ব পাকিস্তান যাওয়া ভারত সরকারের অভিপ্রেত ছিল না। শ্রীদেশাই অনুমান করেছিলেন কবিকে একবার ঢাকায় নিয়ে গেলে নানা টালবাহানায় সেখানে রেখে দেওয়া হতে পারে। তাঁর অনুমান যে অনর্থক নয় পরবর্তী সময়ে তা প্রমাণ হয়েছে। ১৯৭১ সালে কবিকে ঢাকা নিয়ে যেতে ভারত সরকার সর্বতোভাবে সহযোগিতা

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice