ইউক্রেনের লোককথা
অতি প্রাচীন কাল থেকে পুরুষানুক্রমে লোকের মুখে মুখে চলে এসেছে নানা ধরনের লৌকিক কাহিনী, মায়াময় এক জগৎ আর তার নায়কদের নিয়ে গল্প, তাতে ঝলক দিয়েছে রসবোধ, বুদ্ধির চমক, জনসাধারণের প্রজ্ঞা। বহুযুগ ধরে কথন ছিল তার অবলম্বন, কথক এককালে তা নিজে শুনে আবার অন্যদের শোনাত। এই ‘কথন’ থেকেই এগুলির নাম হয়েছে কাহিনী...
অজস্র ইউক্রেনের লৌকিক কাহিনী, তাতে যত নায়ক আর ঘটনার ভিড়, তার কোনোটা খুবই অতীত কালের, কোনোটা আবার তত পুরনো নয়। আশা করি পাঠকদের ভালো লাগবে এ বইয়ের পাত্রপাত্রী, সাধারণ লোকের মধ্যেকার সৎসাহসী সব মানুষদের। আনন্দ দেবে মজার মজার সব কান্ড, পশু-পাখির জ্বলজ্বলে চরিত্র। রূপকথার কাব্যমণ্ডিত নানা ছবিও দেখা যাবে, যেমন যাদু দস্তানা, উড়ন্ত জাহাজ, মহাবীরের ঘোড়া, ‘যে আগুন খায়, শিখায় চুমুক দেয়…’
কাহিনী থেকেই দেশের প্রকৃতি, ঘরের পশুপাখি, বন্য জীবজন্তুর সঙ্গে শিশুদের প্রথম পরিচয়। আর সম্ভবত দোলনাতেই অনেক শিশু প্রথম শুনেছে কেমন করে দাদু একবার তার দস্তানা হারিয়ে ফেলেছিল বনে আর কারা কারা তাতে ঠাঁই নিয়েছিল। একেবারে ছোটো থেকেই পশুপাখির মায়াময় মূর্তিগুলো হয়ে ওঠে তাদের প্রিয়, বার বার সানন্দে শুনতে চায় তাদের কথা। আর একটু যখন বড়ো হয়, তখন আসে অন্য সব কাহিনী। অবাক হয়ে তারা শোনে সেয়ানা দিদি শেয়ালি কীসব করছে: ইউক্রেনের লোককথাগুলিতে গৃহপালিত আর বন্য পশুপাখির মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় এই চরিত্রটিকে। এই সেয়ানা শেয়ালির কাছে প্রায়ই জব্দ হয় মোরগ আর খরগোশ, এমনকি নেকড়ে আর ভালুকও। তবে তার পেজোমি আর শয়তানির প্রতিফলও পেতে হয় তাকে।
অকারণে একথা বলা হয় না যে জীবজন্তু নিয়ে গল্পের ‘একটা চোখ থাকে মানুষের দিকে।’ একই কথা বলা হয় তুলনাগুলিতেও। ‘শেয়ালের মতো সেয়ানা’, ‘নেকড়ের মতো ভক্ষক’। তবে গল্পগুলির স্রষ্টা লোকসাধারণ সর্বদাই লাঞ্ছিতের পক্ষে সহানুভূতি দেখায় তাদের বিপদে-আপদে, ভালোবাসে তাদের ভালোমানুষি, দরদ, বিশ্বস্ততার জন্যে।
সংকলনে রূপকথাও আছে। তাতে কু-এর সঙ্গে—নাগ আর ড্রাগনের সঙ্গে সুকঠিন দ্বন্দ্বে ফুটে ওঠে সহজ মানুষ, সাধারণ মেহনতির বীরত্বব্যঞ্জক চরিত্র। রূপকথার নায়কেরা এসেছে জনগণের মধ্যে থেকে, সে পরিচয় থাকে তাদের নামগুলিতেও—চাষির-পো ইভান, রাখাল ছেলে, কিরিল চামার... নায়কদের নাগমুণ্ড কাটতে হয় কেবল একবারই নয়, মন্দকে শায়েস্তা করতে, বিপন্নকে বাঁচাতে, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে একাধিক বার লড়তে হয় তাদের। রোমাঞ্চকর তাদের ভাগ্যচক্র আর কীর্তিকাহিনীর কথা বলে গল্পগুলিতে জয়গান করা হয় তাদের সাহস, মহানুভবতা আর ক্ষুরবুদ্ধির।
রূপকথাগুলিতে লোককল্পনায় রূপলাভ করে, মহাবীরের শক্তি অর্জন, মানুষের সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য গ্রামীণ মেহনতির স্বপ্ন। ইউক্রেনের বহু, লোককথায় বর্ণাঢ্য চিত্র থাকে অপ্রাকৃত সামর্থ্যধর সব নায়কদের।
তার লক্ষণ থাকে তাদের নামেও—পাহাড়-ঠেলিয়ে, পাকানো-মোচ, হিমদাদু, ওক-উপড়িয়ে, পাথর-গড়িয়ে প্রভৃতি। বহুকাল থেকে মানুষের অমানুষিক শক্তির কথা ভেবে এসেছে লোকে আর সে স্বপ্ন গেঁথেছে রূপকথার দূরন্ত বয়ানে...
সংকলন শেষ হয়েছে যেসব গল্পে তাতে আমরা দেখব সাধারণ লোকেদের, ইউক্রেনের চাষিদের। তাদের কাজকর্ম, কারিগরি, ঘরকন্না সেইসব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যসূচক যেখানে এগুলি রচিত। এসব গল্পের বিষয়বস্তুও ধনী আর গরিব, উদার আর নিষ্ঠুর, যারা ন্যায়পথে চলে আর যারা মনে করে অন্যায় ক'রেও দিন কাটানো যায়, তাদের মধ্যে যা সম্পর্ক তার লক্ষণাক্রান্ত। কাহিনীগুলিতে উপহাস করা হয় জার আর ধনীদের আত্মম্ভরিতা আর নিবুদ্ধিতা নিয়ে, সাধারণ যেসব মানুষ দুঃখকষ্টে উত্তীর্ণ হচ্ছে, জয়লাভ করে তাদের ক্ষিপ্রবুদ্ধি, রসবোধ আর সাহস।
লৌকিক কৌতুক আর তীক্ষ্ণ শ্লেষে এগুলি উজ্জল, পরের ঘাড় ভেঙে যারা লাভবান হয়, এ শ্লেষ উদ্যত তাদের সবার বিরুদ্ধে।
প্রকৃতির শক্তিকে বশীভূত, গুরুভার শ্রমকে সহজসাধ্য, জীবনযাত্রাকে সুন্দর, অভিশাপ আর অত্যাচারকে পরাস্ত, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করে সমস্ত লোক যাতে স্বাধীনভাবে সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটায়, অভাব-অনটন না থাকে, তার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments