হেগেল ও বিশ্ব ইতিহাস
হেগেল বিশ্ব ইতিহাসের দর্শন রচনা করিয়াছেন। এই আলোচনায়ই তাহার দর্শনের মর্ম সহজে ফুটিয়া উঠিয়াছে। কি করিয়া আত্মা (spirit) সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়, তাহা দেখানোই বিশ্ব ইতিহাসের কার্য। বিশ্ব ইতিহাসেই ‘প্রজ্ঞার’ (reason) উদয় হয়; ইহারই ভেতরে ‘প্রজ্ঞা’ তাহার বিকাশ ও স্বতস্ফূর্ততার পথ খুঁজিয়া লয় এবং পরিশেষে আত্মোপলব্ধির আনন্দে সার্থক হয়। হেগেল লিখিত ইতিহাস পর্যালোচনায় এই মূল কথাটি মনে রাখিতে হইবে।
ইতিহাসকে দেখা হইয়াছে তিন রকমে (১) মৌলিক ইতিহাস (Original History) (২) ভাবমূলক ইতিহাস (Reflective History) (৩) দার্শনিক ইতিহাস (Philosophical History). হিরোটাস এবং থুসিডিডস্ লিখিয়াছেন প্রথম শ্রেণীর ইতিহাস। তাঁহাদের রচনা সম-সাময়িক তথ্য এবং ঘটনাদি বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাহারা এমন জিনিস রচনা করিয়াছেন যাহার ভিতরে হয়তো বা তাহাদের নিজেদেরই অংশ ছিল অথবা তাহারা ছিলেন সে সকল ঘটনার প্রত্যক্ষ এবং নিবিষ্ট দর্শক। ঐতিহাসিক ঘটনাটির মর্ম এবং তাহাদের আপন ভাব ও ধারণা যেন অনন্য। দ্বিতীয় শ্রেণীয় ইতিহাসে সম-সাময়িক ঘটনার সমাবেশ কম; বর্তমানকে ডিঙয়াইয়া সূত্র রচনাই ইহার লক্ষ্য। আরো একভাবে এইরূপ ইতিহাস রচনা সম্ভব। অতীত ইতিহাস হইতে নীতি আহরণ করিয়া বর্তমানে উপযোগী শিক্ষা সংগ্রহ ও ভাবমূলক ইতিহাস চর্চার লক্ষ্য হইতে পারে। এইরূপ ইতিহাসকে আক্রমণ করিয়া হেগেল লিখিয়াছেন, অতীতের ধর্ম ও বর্তমানের প্রতিভার ভিতরে মস্ত পার্থক্য রহিয়াছে। বর্তমানে জীবন এবং স্পন্দনের ভিতরে অতীতের নিষ্প্রভ স্মৃতি নিতান্ত বেমানান হইয়া পড়ে। অপর একরূপ ভাবমূলক ইতিহাস আছে; এইরূপ লেখা সাধারণত তথ্য হইতে বিচ্ছিন্ন। এই শ্রেণীর ইতিহাসের একটি ব্যাপক দৃষ্টি আছে বলিয়াই ইহা দার্শনিক ইতিহাসের পথপ্রদর্শক। এই শ্রেণীর রচনাই ‘প্রজ্ঞা’কে সকল ঐতিহাসিক ঘটনার নির্দেশক এবং বিশ্বের নিয়ামকরূপে উপস্থিত করিয়াছে।
বিশ্ব প্রকৃতপক্ষে প্রজ্ঞারই বাহ্য-প্রকাশ; বিশ্ব ইতিহাস প্রজ্ঞারই জয়যাত্রার ইতিহাস। দার্শনিক ইতিহাস এই সত্যটুকুকেই উদ্্ঘাটিত করিয়াছে। বিশ্ব-ইতিহাস একটি পরিচিন্তিত ক্রম (rational process)। ইহার মূল সত্য ‘আত্মা;, ইহাই বিশ্বের অন্তঃস্থিত পরমসত্তা। প্রজ্ঞা অথবা আত্মসৃজন ক্রিয়ার জন্য সকল সময়ই সম্পূর্ণভাবে আত্মনির্ভর। প্রজ্ঞা প্রজ্ঞার উপরই ভিত্তি করিয়া দাঁড়াইয়া আছে; প্রজ্ঞার লক্ষ্য এবং পরিণতি প্রজ্ঞা স্বয়ং; এই লক্ষ্যে পৌঁছিবার জন্য যে শক্তি ইহার পশ্চাতে কাজ করিতেছে তাহাও প্রজ্ঞা। বিশ্ব এবং বিশ্বের সকল তথ্যাদির ভিতরে প্রকটিত হইতেছে প্রজ্ঞারই গৌরব এবং মর্যাদা।
এখন বিচার্য আত্মার বিশেষ ধর্মটি কি? আত্মা অথবা প্রজ্ঞা তাহার আপন ‘আইডিয়া’কে যথার্থ করিবার জন্য কি উপায় অবলম্বন করিতেছে? কিরূপ সমাজ কাঠামোর ভিতরে আত্মা তাহার বিকাশের কার্য করিয়া যাইতেছে? হেগেল এই সমাজ-কাঠামোকেই রাষ্ট্র আখ্যা দিয়াছেন।
জড় এবং আত্মা পরস্পর-বিরোধী এবং বিরুদ্ধ স্বভাববিশিষ্ট। জড়ের ধর্ম মধ্যাকর্ষণ; আত্মার স্বরূপ স্বরাট। জড়ের গড়ন যৌগিক এবং গতি বহির্মুখী। আত্মা আপনার ভিতরেই সিদ্ধ, একত্বের সন্ধানে তাহাকে বাহিরের দিকে যাইতে হয় না। জড়ের ঐকান্তিক চেষ্টা আপন ‘আইডিয়া’কে সিদ্ধ করা; কিন্তু কখনো যদি তাহা সম্ভব ইহত তবে জড় আত্মাতেই পর্যবসিত হইয়া পড়িত। আত্মা একটি স্ব-পর্যাপ্ত সত্তা বলিয়াই স্বরাট তাহার অতি নিজস্ব। আত্মার স্ব-বোধের (self-consciousness) ভিতরে বিষয় (object) এবং বিষয়ী (subject) দুইই এক হইয়া যায়। আত্মার স্ব-বোধ তাহার নিজের সম্পর্কেই জ্ঞান।
বিশ্ব-ইতিহাসের লক্ষ্য, মানুষ মানুষ হিসাবে স্বাধীন, এই বোধটি। প্রাচ্যদেশীয়রা ধারণা করিয়াছিল মানুষ স্বাধীন ব্যক্তি হিসাবে। ইতিহাসে স্বাধীনতাবোধের ইহা অতন্ত্য অপূর্ণ রূপ। গ্রীক রোমানরা জানিয়েছিল, কতিপয় ব্যক্তিই স্বাধীন। কিন্তু তখনও মানুষ যে মানুষ হিসাবে স্বাধীন, এই বোধটি জন্মাইতে পারে নাই। মানুষের এই বোধটি জন্মাইয়াছে জার্মানগণের ইতিহাসে। হেগেল স্বাধীনতা বোধের এই তারতম্য দিয়াই ইতিহাসের স্তর নির্ণয় করিয়াছেন।
আত্মার পক্ষে আপন স্বাধীনতা সম্পর্কে জ্ঞানই আধ্যাত্মিকতার শেষ পরিণতি। বিশ্বের ইতিহাস ক্রমাগত এই লক্ষ্য অভিমুখেই ছুটিয়াছে। ইহারই জন্য বিশ্বের পরিসীমার ভিতরে এতো ঘটনা-বিপর্যয়, এতো আবর্তন, বিবর্তন, এতো যুদ্ধ-বিগ্রহ। উপরোক্ত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments