স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের ভূমিকা
এই নিবন্ধের শিরোনামে স্বাধীনতা সংগ্রাম কথাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ বললে ’৭১ সালের নয় মাসের সময়কালের মধ্যে আলোচ্য প্রসঙ্গটি সীমাবদ্ধ থাকে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, আরো আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বভিত্তিক চেতনা থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তরণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ডাক এবং সর্বশেষ পর্যায়ে মহান সশস্ত্র যুদ্ধ—সব কয়টি পর্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ কথাটি গ্রহণ করলে। ’৪৭ থেকে ’৭১-এর প্রতিটি পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের অবদান বিশাল এবং সেটাই স্বাভাবিক। শ্রেণী শোষণ থেকে আরম্ভ করে সব ধরনের শোষণ, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি, কমিউনিস্টরাই সর্বকালে সর্বদেশে লড়াই করে এসেছে। বুর্জোয়া নেতৃত্বও নানা ধরনের সামাজিক অবিচার, লিঙ্গ বৈষম্য ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। কিন্তু শ্রেণী স্বার্থের কারণে তারা প্রায়শ দৃঢ়তার সঙ্গে লড়তে পারে না, মাঝপথে আপোষ করে।
অবিভক্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসও তাই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এসেছিল ভারতের বুর্জোয়ার সঙ্গে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের আপোষের মাধ্যমে দেশটিকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত করে, পাকিস্তান নামক এক আজব ধর্মভিত্তিক দেশ তৈরি করে। ভারতের ইতিহাসবিদগণের অধিকাংশই ভারতের স্বাধীনতার একক কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসকে। মহাত্মার নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের বিরাট গুরুত্বকে অস্বীকার করবো না। কিন্তু এর পাশাপাশি আরো দুটি স্রোত ছিল যাকে অস্বীকার করা হবে ইতিহাসকে খন্ডিতভাবে দেখা। একটি ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রবল স্রোত, ক্ষুদিরাম থেকে শুরু করে সূর্যসেন ও পরে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের সশস্ত্র যুদ্ধ যার অন্তর্ভুক্ত। আরেকটি স্রোত ছিল শ্রমিক-কৃষকের লড়াই যার নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা।
একইভাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীতে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের বিশাল অবদানকে উপেক্ষা করার একটি প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে অথবা মিডিয়ার প্রচারের ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বা আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বামপন্থীদের অবদানকে হয় অস্বীকার করেন অথবা যতোটা সম্ভব ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন। একথা অস্বীকার করা যাবে না, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বেই জাতীয়তাবাদের বিশাল জাগরণ ঘটেছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিস্ময়কর বিজয় এবং ছয় দফার প্রতি তার অনমনীয় অঙ্গীকার এবং ১৯৭১-এর মার্চের ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চের ভাষণ সব কিছুই জাতিকে দ্রুত স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবের মতো অতো বিশাল মাপের নেতৃত্বও আর আসেনি। কিন্তু স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলন এবং ’৭১-এর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সবটাই আওয়ামী লীগের একক কৃতিত্ব বলে যে দাবি তা ইতিহাস বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে শেখ মুজিবের বিপরীতে জিয়াউর রহমানকে দাঁড় করানোর যে প্রবণতা তা নেহায়েতই হাস্যকর। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তার যেটুকু ভূমিকা ছিল সেটুকু স্বীকার করতে আমাদের কার্পণ্য থাকা উচিত নয়। শেখ মুজিবের নাম করে তিনি যে রেডিও ভাষণ দিয়েছিলেন (২৬ মার্চ ১৯৭১, চট্টগ্রাম), তা সেই সময় একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু একজন মেজর ডাক দিলেন আর সবাই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন এমনটা ভাবা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল গোড়া থেকেই। এখানে বামপন্থী বলতে আমি কমিউনিস্ট পার্টি এবং মওলানা ভাসানীকে বোঝাচ্ছি। মওলানা ভাসানী একদা মুসিলম লীগের নেতা ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান-পরবর্তীকালে ভাসানীর যে উত্তরণ ঘটেছিল তাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং শ্রমিক কৃষক মেহনতী মানুষের সমর্থক ও প্রচারক এবং কমিউনিস্টদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তাই পাকিস্তান আমলে ভাসানীই ছিলেন সব বামপন্থীর নেতা। ষাটের দশকে কমিউনিস্ট শিবিরে বিভক্তি ও বহুধা বিভক্তি এসেছিল। কমিউনিস্টদের কোনো কোনো অংশের সঙ্গে ভাসানীর সম্পর্কের অবনতিও হয়েছিল। আবার কমিউনিস্টদের একটি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তত্ত্বও উপস্থিত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments