বাবা আমার জীবনের সূচনা সংগীত
বাবা খুব ভোরে উঠতেন। উঠে গান বাজাতেন আর পড়ার টেবিলে বসতেন। সেই ছোটবেলা থেকেই আমাদের ঘুম ভাঙতো গানের সুরে। আর বাবা যে পড়ার টেবিলে বসতেন এটা আমাদের কাছে ছিল নিত্যদিনের অভ্যাসের মতো। তাঁর লেখালেখি বা তিনি যে বরিশাল উদীচীর সভাপতি—এটা খুব স্বাভাবিক ছিল আমাদের কাছে। তিনি একাধারে একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন দক্ষ সংগঠক। তবে আমার কাছে তিনি শুধুই ‘বাবা’। আর বাবার সঙ্গে একদম ছোটবেলা থেকে যেতাম উদীচীতে। বিজ্ঞজনদের কথা শুনেই আমার বড় হওয়া। কি বুঝতাম জানি না। তবে বাবার সঙ্গেই থাকতাম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন বাবার হাত ধরে হেঁটে শহিদ মিনারে যেতে পারতাম না, তখন যে ভ্যানে বাদ্যযন্ত্র থাকতো সেই ভ্যানে উঠিয়ে দিতেন। যে কোনো আয়োজনে বাবার সঙ্গে মঞ্চে অথবা সামনের সারিতে বসতাম। এভাবেই চলছিল দিন। বাবার সঙ্গে উদীচীর সম্মেলন বা রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলনে ঘুরেছি বিভিন্ন শহর। দেখেছি—জেনেছি—শিখেছি।
কিন্তু যখন আমার ১৮ বছর পূর্ণ হল, তখন পেলাম বরিশাল উদীচীর সদস্যপদ। তখন বাবা একটা কথাই বললেন, তিনি যে বরিশাল উদীচীর সভাপতি তার কোনো সুযোগ যেন আমি না নিই। তখন উদীচীতে আমার ভিন্ন আচরণ—মঞ্চে মাদুর বিছানো, চেয়ার গোছানো দিয়ে শুরু করলাম। এরপর গানের কোরাসে। একসময় আমি উপস্থাপক, বাবা বক্তা কিংবা সভাপতি। বরিশালে এভাবে চললো বেশ কয়েক বছর। মাঝে চাকরির সুবাদে বাবা খুলনা গেলেন। তারপর ২০০৪ সালে বাবা শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পর ঢাকায় এলেন; একই বছর আমিও স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকায়।
২০০৬ সাল থেকে আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজ শুরু করি। পাশাপাশি ২০০৭ থেকে বাবার সঙ্গেদৈনিক বাংলাদেশ সময়েসহ-সম্পাদক হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ করি প্রায় ৩ বছর। সে এক অন্যরকম অনুভূতি—বাবার অধীনস্থ হয়ে কাজ করা। এরই মধ্যে হুট করে বাবা আমাকে দিয়ে একটি বইয়ের কাজ করালেন। সেটাই আমার বইয়ের কাজে হাতেখড়ি। বর্তমানে আমার ১৩টি প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। বাবা দেখে গিয়েছেন আমি আরও দু’টি বইয়ের কাজ করছি। চলে যাবার মাত্র কয়েক দিন আগে একটি বইয়ের সংশোধন করে আমার হাতে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ২২তম জাতীয় সম্মেলনে বাবা উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর এলো অন্য ঝঞ্জা। উদীচীর সেই সম্মেলনে নানা রকম ঝামেলার সৃষ্টি হয়। বাবার সঙ্গে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। বাবাকে যখন এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতাম, তিনি এড়িয়ে যেতেন। বলতেন, ‘আমি ওগুলো কিছু দেখি না।’ বাবার এই না-শোনা, না-দেখার অভ্যাস বহুদিনের। তিনি সহজে এড়িয়ে যেতে পারতেন তাঁর অপছন্দের ঘটনাগুলো। যা বলছিলাম—বাবা বলতেন তিনি অসমাপ্ত সম্মেলন শেষ করবেন। করেও ছিলেন তাই। পেরেছিলেন কেবল তাঁর দৃঢ় মনোবলের কারণে। সেখানে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী সভাপতি নির্বাচিত হন। আমি আর আমার সন্তান অভ্র দেখছিলাম ফেইসবুক লাইভে। বাবা শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে দৃঢ় চিত্তে স্লোগান দিলেন—‘জয় উদীচী’। যেটা আমার সন্তানের রক্তেও ধাবিত হল। সাড়ে সাত বছরের আমার সন্তান সেটি শুনে কেবল একটা কথাই বলল, ‘আমি নানের মত উদীচীর প্রেসিডেন্ট হতে চাই’। এটাই রক্ত। যে রক্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহন করে।
বাবা প্রায় অনিশ্চয়তার অনেক কাজ গুছিয়ে এনেছিলেন। চলে যাবার কয়েকদিন আগে হুট করে আমাকে ফোন করে বললেন, ‘অভ্রকে নিয়ে বাসায় আসো। নতুন কম্পিউটার এনেছি অভ্র উদ্বোধন করলে কাজ শুরু হবে।’ গেলাম আমি আর অভ্র। অভ্র উদ্বোধন করল। তারপর বাবা আমার সঙ্গে নতুন এক কাজ নিয়ে বসলেন—একটি সহজ ব্যবহারিক অভিধান হবে। বাবার সঙ্গে আর একজন ও আমি সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করব। অনেক আলোচনা হলো কাজটি নিয়ে। বাংলা একাডেমির একটি অভিধান আমাকে দিলেন। বললেন কাজের সময়সীমা দুই বছর। সব শুনে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments