মানুষের নাম
লেখক: হুসেন আবাসজাদে (জন্ম: ১৯২২)
[সাহিত্যিক জীবনের শুরু কবি হিসাবে, কিন্তু সুপরিচিতি লাভ করেন গদ্যলেখক হিসাবে। পিতৃভূমির মহাযুদ্ধে সোভিয়েত জনগণের কীর্তিকাহিনী রূপায়িত হয়েছে তাঁর ‘জেনারেল’, ‘মুসি আবেল, আপনি কে?’, ‘কারাদাগের ঘটনা’ প্রভৃতি সাহিত্যরচনায়। ‘জলাবর্ত’ উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে একটা বিরাট সময়ের ছবি প্রায় শতাব্দীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত। এতে দেখান হয়েছে নতুন জীবনের ঘূর্ণাবর্তে প্রতিটি মানুষের জড়িয়ে পড়ার অনিবার্যতা, এমনকি যারা খুব সক্রিয় নয় তাদেরও। সাধারণ শ্রমিকদের চরিত্রগুলি চমৎকার পরিস্ফুট হয়েছে তাঁর ‘সুপারিশ’ উপন্যাসে এবং এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ‘মানুষের নাম’ ছোট গল্পে।]
ওয়াহিফ স্ট্রীটে পিরভের্দি ট্রলিবাস থেকে নামল। রেইনকোটের পকেট থেকে ঠিকানা-লেখা-কাগজটা বার করল, কাছের বাড়ীটার নম্বর দেখল। ঠিক আছে। কেবল রাস্তাটা পেরিয়ে গিয়ে আর একটু এগিয়ে যেতে হবে—তাহলে পাওয়া যাবে ঐ বাড়ীটা যেখানে সেই ফাতুল্লা থাকে।
কোনরকম তাড়াহুড়ো না করে পাগুলোকে টেনে টেনে সরু ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলল বুড়ো পিরভের্দি। তাড়াহড়ো করবেই বা কেন? পেনশনভোগীর হাতে অনেক সময়। এই ফটোগ্রাফারের কাছে যাবার তার কোন ইচ্ছাই ছিল না—তাকে সে জানে না, কয়েকবার মাত্র বাকুর খবরের কাগজে তার নাম দেখেছে: ‘ফটো ফাতুল্লা চেম্বেরেকেন্দলির’। বহুদিন আর তাও দেখা যায় নি। আর গতকাল যখন পিরভের্দি তার অভ্যাসমত প্রিমস্কি এভিনিউ দিয়ে যাচ্ছিল তখন একটা বিজ্ঞাপন তার চোখে পড়ে: সাংবাদিক সমিতির প্রদর্শনী হলে শহরের সর্বজ্যেষ্ঠ ফটোগ্রাফার ফাতুল্লা চেম্বেরেকেন্দলির আশী বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁর তোলা ছবিগুলির একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে, সবাইকে আমন্ত্রণ জানান হচ্ছে; পিরভের্দিও সেখানে গিয়ে ঢুকেছিল, তার তো সময় যথেষ্ট আছে।
দুটো মাঝারি আকারের ঘরে তার তোলা ফটোগুলিকে বড় করে পিচবোর্ডে লাগিয়ে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এগুলি যেন অতীতের কিছ মুহূর্তের ছবি, যা এখন ইতিহাস। এই তো দেশে প্রথম ইলেকট্রিক রেললাইনের উদ্বোধন যা বাকুর সঙ্গে সব থেকে পুরনো তৈলাঞ্চল—সাবুনচি গ্রামের যোগাযোগ স্থাপন করে। সেটা ১৯২৬ সাল। ছোঁড়াখোঁড়া পোশাক পরা লোকেরা সূর্যালোকিত প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। হাসিহাসি মুখ, ফুল, ফেস্টুন। প্রথম ইলেকট্রিক ট্রেনটি রওনা হবে হবে করছে। তারপরে—জাব্বর কারিয়াগ্দীর পোর্ট্রেট। এই সুগায়ক তার খঞ্জনীর ওপর ঝুঁকে পড়ে গাইছে, সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বুড়ো পিরভের্দির মনে হল তার চমৎকার চড়া গলায় গাওয়া মুগাম সুরের ‘খায়রাতী’ গান শুনতে পেল। এই যে আরো বিশের দশকের ফটো—আলি বাইরামভের নামে ক্লাব, মেয়েরা বোরখা খুলে ফেলছে। পিরভের্দির বেশ ভাল মনে আছে এই ফটোটার কথা। এক সময় এই ফটোটা অনেক খবরের কাগজ আর পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এই ফটোটার সামনে ছোট ঝুলের ফ্রক পরা তিনজন ছাত্রী দাঁড়িয়ে কি বিষয়ে যেন তর্ক করছিল।
পিরভের্দি ধীরেসুস্থে এক ফটো থেকে অন্য ফটোর দিকে যাচ্ছিল। আরে এটা কি? দরজার কাছে লম্বাটে ফটোটার দিকে তাকিয়ে সে হতবাক হয়ে গেল। সমুদ্র তীরে নির্মাণকার্য চলছে। জেটির কাছে—পাথরের চাঁই বোঝাই হয়ে বজরা দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ওখানে আগেকার দিনের স্টীমচালিত এক্সক্যাভেটর দাঁড়িয়ে। সমুদ্রতীর লোকে লোকারণ্য—মাটিকাটা মজুর, গাড়োয়ান, ছুতোর। সামনের দিকে দেখা যাচ্ছে—দুজন যুবক কাঠের পাটার ওপর বালিভরা ঠেলাগাড়ী নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মুখ দেখা যায় ভাল করে লক্ষ্য করলে, অন্তত বাঁদিকে যে আছে তার। এ নিশ্চয়ই রিজভান, ভেবে পিরভের্দি উত্তেজিত হয়ে পড়ল। রিজভান, তার পুরনো বন্ধু, এক গ্রামের লোক। সেই কবে যেন তারা একসঙ্গে বাকু এসেছিল, একসঙ্গে বিবি-আইবাত খাঁড়ি ভরিয়ে তোলার কাজে লেগেছিল। আর এই দ্বিতীয়জন আবদুল্লা নয় তো? হ্যাঁ ঠিকই, পালোয়ান আবদুল্লা, যে এই বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই সরিয়ে দিত আর এখানের সব লোক অবাক হয়ে যেত। অন্তত সেই পুরনো দিনগুলিতে পিরভের্দির তাই মনে হত। ওঃ, ইলিচের খাঁড়ি, কোনদিন ভুলবার নয়। আবার পিরভের্দির কানে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments