বীরব্রতী ভাসিয়া
বন্ধুরা ওকে বলত জরদ্গব। তার ঢিলে-ঢালা, জবুথুবু, ভ্যাবাচ্যাকা স্বভাবের জন্যে। ক্লাসে কোনো সাপ্তাহিক পরীক্ষার সময় কখনোই ওর সময়ে কুলাত না, প্রশ্নটা মাথায় ঢুকতে ঢুকতে ঘন্টা পড়ে যেত। চা খেতে বসলে তার টেবিল পিরিচের চারপাশে জমত চায়ের ডোবা। চলত এদিক-ওদিক হেলে দুলে, নির্ঘাৎ ধাক্কা খেত টেবিলের কানায়, নয়ত উল্টে পড়ত চেয়ার। নতুন জুতো হপ্তার মধ্যেই এমন তুবড়ে যেত যেন ওই পরে সে সেনাপতি সুভোরভের সঙ্গে আল্প্স্ পর্বত পেরিয়েছে। মুখের ভাব ঢুলুঢুলু, যেন এইমাত্র ঘুম ভাঙল, নয়ত এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে। সবকিছুই ওর খসে পড়ত হাত থেকে, কিছুই উৎরাত না। এক কথায় জরদ্গব।
গায়ে আঁট হয়ে বসত কোট, প্যান্টে পা ঢুকত কোনোক্রমে। মুটকো মুখের ওপর থলথলে তিন থাক-মাংস: দুটি চোখের ওপরে, ভুরুর গোড়ায়, তৃতীয়টি নাক আর ওপরের ঠোঁটের মাঝামাঝি। যখন ও উত্তেজিত হয়ে উঠত অথবা বাইয়ের হিম থেকে ফিরত, তখন এই থাকগুলোই লাল হয়ে উঠত সবার আগে।
সবাই ভাবত ওর স্থুলতার কারণ ওর পটুকত্ব: নইলে অত মোটা সে হল আর কী থেকে? আসলে কিন্তু খেত সে কম। ভালো লাগত না তার খেতে। ও কম্মটি সে সইতে পারত না।
ও যে জরদ্গব সেটা লেখা ছিল ওর মুখে, জানানি দিত তার শিথিল, এলিয়ে পড়া ভাবভঙ্গিতে, শোনা যেত তার চাপা-চাপা গলার স্বরে। অসুন্দর এই মোটা দেহের তলে কী লুকিয়ে ছিল সেটা কেউ জানত না।
অথচ বুকের তলে ওর স্পন্দিত হত বীরব্রতীর মহানুভব হৃদয়। নিজের নিভৃত স্বপ্নে ও নিজেকে দেখতে পেত ঝকমকে ইস্পাতের বর্ম পরা, পালক-ওড়ানো শিরস্ত্রাণের মুখাবরণ নামানো, চেপে আছে স্ফুরিত-নাসা শাদা ঘোড়ার পিঠে। এই বেশে সে ছুটে বেড়াচ্ছে দুনিয়ায়, দুর্বল ও অন্যায়-পীড়িতদের রক্ষা করে অসংখ্য কীর্তি স্থাপন করছে। ও হল নামহীন এক নাইট। কেননা নাইটদের সাধারণত থাকে গালভরা বিদেশী নাম—রিচার্ড কিংবা রোদরিগো অথবা আইভ্যানগো। আর ওকে সবাই ডাকে ভসিয়া বলে, ও নামটা মোটেই কোনো নাইটকে মানায় না।
স্বপ্নে তার ধুমসো বেঢপ চেহারাটা হয়ে ওঠে সুঠাম আর নম্র, গতিতে দেখা দেয় ক্ষিপ্রতা আর নৈপুণ্য। ঝকমকে বর্মের তলে সব ত্রুটি ওর চাপা পড়ে যায় মুহূর্তে।
তবে আয়নার সামনে দাঁড়ালেই আবার সবই ফিরে আসত স্বস্থানে। অপরূপ এই নাইটের বদলে সে সামনে দেখতে পেত জালার মতো একটা ছেলে, গোল মুটকো মুখে তার লাল হয়ে উঠেছে থাক তিনটে।
নাইটের অযোগ্য চেহারাটার জন্যে সে এ রকম সময় নিজেকেই ক্ষমা করতে পারত না।
বিদ্রূপ-পরায়ণ আয়নাটা ছাড়াও তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনত তার মা। তার পদপাতে গেলাসগুলো করুণ আর্তনাদ তুলেছে শুনতে পেয়ে মা রান্নাঘর থেক চেঁচাত, ‘সাবধান! একেবারে হাতি ঢুকেছে চীনেমাটির দোকানে!’
এমন কথা কিনা এক মহানুভব নাইটকে?
বন্ধুর কাছে তার স্বপ্নের কথা বলতে গিয়েছিল সে, কিন্তু কোনো সমর্থন পেলে না।
বর্মের কথা শুনতেই বন্ধু ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘অমন মোটা শরীর কোনো বর্মেই ঢুকবে না।’
বন্ধু ভাবতেও পারেনি সে ভাসিয়ার একেবারে আঁতে ঘা দিয়েছে।
সময় পেলেই সে ছুটত মিউজিয়মে। বড়ো বড়ো হলে এখানে ভারি ভারি সোনালি ফ্রেমে ছবি টাঙানো, কোণে কোণে হলুদ হয়ে আসা মর্মরের মূর্তি। মহাশিল্পীদের ক্যানভাসগুলো সে পেরিয়ে যেত নির্বিকারভাবে, যেন সেগুলো বহুপরিচিত পোস্টার মাত্র, চলে যেত তার স্বপ্নে ঘরটিতে। কোনো ছবি ছিল না এখানে। দেয়ালে টাঙানো তরোয়াল আর বর্শা, মেঝেয় দাঁড়িয়ে বর্মাবৃত সব নাইট-মূর্তি।
ডিউটি-রত বুড়িটাকে লুকিয়ে সে ছুঁয়ে দেখেছিল বর্মের ইস্পাৎ, আঙুলে পরখ করেছিল তরোয়ালে ধার কেমন। কালো নাইটের কাছ থেকে সোনালি, সোনালি থেকে রূপোলী নাইটের কাছে সে চলে যেত আপন মনে। কতকগুলোর সঙ্গে ছিল তার বন্ধুত্ব, কারো প্রতি সংযত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments