প্রাচীন মিসরের মেহনতী মানুষ
প্রাচীন মিসরের জনৈক ভদ্রলোক তার ছেলেকে নিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিতে যাচ্ছেন আর পথে পথে উপদেশ দিয়ে চলেছেন, বাপুরে, খেটেখুটে মন দিয়ে লেখাপড়া করো, যাতে লেখাপড়া শিখে একজন লিপিকার (ঝপৎরনব) হয়ে উঠতে পার। আমাদের এই সমাজে পেটের ধান্দা মিটাবার জন্য নানা জনে নানারকম পেশা নিয়ে মেহনত করে চলেছে। কিন্তু এদের মধ্যে একমাত্র লিপিকারেরাই সুখে আছে, আর সকলের দুর্দশার চূড়ান্ত। কর্মকারদের মধ্যে থেকে কেউ রাষ্ট্রদূতের পদ পেয়েছে, এ আমি কোনো দিন দেখিনি। দেখছি তো কামারদের—এরা দিনের পর দিন এদের চুল্লির আগুনের সামনে বসে কাজ করে চলে, এদের হাতের আঙ্গুলগুলো কুমীরের নখের মতো বেঁকে যায় আর এদের গা থেকে মাছের ডিমের চেয়েও বেশী দুর্গন্ধ ছড়ায়... রাজমিস্ত্রীরা কি সব শক্ত শক্ত পাথর ভেঙ্গে কাজ করে। সারাদিন এইভাবে কাজ করার পর তাদের হাত অবশ হয়ে আসে, অবসন্ন হয়ে আসে দেহ-রাত্রিবেলা তারা কুঁকড়ে-মুকড়ে পড়ে থাকে, পরদিন সূর্যোদয় পর্যন্ত ওইভাবেই ঘুমিয়ে কাটায়। তার হাঁটু আর পিঠের শিরদাঁড়া যেন ভেঙ্গে গেছে, উঠে দাঁড়াবার মতো জোর নেই। নাপিত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকের চুল-দাড়ি কেটে চলে। একমাত্র খাওয়ার সময় ছাড়া তার একটু বসবার ফুরসুত নেই। কাজের সন্ধানে সে বাড়ি বাড়ি ছুটাছুটি করে বেড়ায়। পেট ভরবার জন্য সে হাত দুটোকে ক্ষয় করে চলে। চাষী দিনের পর দিন এক কাপড়েই কাটিয়ে দেয়, বদল করবার মতো দ্বিতীয় কাপড় তার নেই। তার হাতের আঙ্গুলগুলি সব সময়ে কাজে ব্যস্ত, গরম বাতাসে হাত দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। যখন সে একটু অবসর পায়, ক্ষেতের কাদামাটির উপর বসেই বিশ্রাম নেয়। যখন সে সুস্থ থাকে তখন গৃহপালিত পশুদের সঙ্গেই তার দিন কাটে। আবার যখন অসুস্থ হয়, তখনও সেই পশুদের মধ্যেই খালি মাটির উপরে শুয়ে থাকে। রাত্রিতে সে খুব কমই বাড়িতে যায়। আর যদিওবা যায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে আসতে হয়। কাজেই লেখাপড়ার দিকে ভালো করে মন দাও, এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, এমন পেশা আর একটিও নেই।
একাদশ রাজবংশের আমলে লিখিত ‘দুয়াউফ-এর ছেলে খেতীর শিক্ষামালা’ নামক বইটিতে তখনকার দিনের মিসরের সাধারণ মেহনতী মানুষের নিদারুণ জীবন কথার চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছিল।
মিসরের সমৃদ্ধ রাজধানীর এক প্রান্তে চাঁদের মধ্যে কলংকের মতো বস্তির মধ্যে বাস করত হস্তশিল্পী আর কারিগরেরা। নিজ নিজ পেশার পরিবর্তন করা এবং নাগরিক ব্যাপারে মাথা ঘামানো এদের পক্ষে আইনতঃ নিষিদ্ধ ছিল। ফ্যারাওয়ের রাজকীয় ভূসম্পত্তি বা জায়গীরদারদের জায়গীরে যারা জমি চাষের কাজ করত তারা ছিল ভূ-দাস। এদের ক্রীতদাস বলা যায় না এই জন্য যে তাদের বিকি-কিনি করা চলতো না। এবং যত সামান্যই হোক না কেনো, তাদের নিজস্ব বাড়ি ছিল। কিন্তু তারা জমির সঙ্গে এমনভাবে গাঁটছড়ায় বাঁধা ছিল যে, জমির মালিকানা বদলে গেলে তারা আপনা থেকে অপর মালিকের হাতে গিয়ে পড়তো। মালিকদের লাভের জন্য তাদের দিয়ে অপরের কাছে ভাড়া খাটানোও চলত। নাগরিক হিসাবে তাদের কতকগুলি বিধিসম্মত অধিকার ছিল বটে, কিন্তু তা শুধু কথার কথা, উচ্চতর শ্রেণীগুলি সব সময়ই নানাভাবে তাদের নির্যাতন করত। এরা ক্রীতদাস নয়, কিন্তু ক্রীতদাসের চেয়ে কম কিসে?
মিসরের মেহনতী জনসাধারণ এইভাবে অকথ্য দুঃখ-দুর্দশা, অভাব ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতো। এরা ছাড়া ক্রীতদাসরাও ছিল। বিদেশী ও যুদ্ধবন্দীদের ক্রীতদাস করে নিয়ে আসা হতো। কিন্তু মিসরের অর্থনীতির উপর তাদের প্রভাব ছিল খুবই সামান্য। সমসাময়িক জগতে সভ্যতার ক্রমবিকাশে ক্রীতদাস ব্যবস্থার যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল, মিসরের ক্ষেত্রে তা ছিল গৌণ। ব্যক্তিগত ভাবে ক্রীতদাস রাখার সুযোগ ছিল না বললেই চলে! ফ্যারাওরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার যুদ্ধবন্দী নিয়ে এসে তাদের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments