অপরিচিত মনীষীর নাম পরিচিত জনতার সরণিতে
ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়—নামটি যে আমাদের দেশে একেবারেই অপরিচিত, তা হয়তো নয়। তবে সে পরিচিতির পরিধি যে খুবই সীমিত, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। যাঁরা এই নামটির সঙ্গে পরিচিত, তাঁদেরও খুব অল্পসংখ্যকই এই নামের মানুষটির কৃতি ও অবদানের স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত। অথচ, মনীষী বলতে প্রকৃত অর্থে যা বোঝায়, ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন তা-ই। যিনি মনীষাসম্পন্ন তাঁকেই তো বলে মনীষী। আর ‘মনীষা’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে ‘মনের ঈষা’। ‘ঈষা’ মানে ‘লাঙ্গলের কাষ্ঠ নির্মিত দণ্ড’। ‘ঈষা’ যেমন লাঙ্গলটিকে ধারণ করে ও সঠিকভাবে চালিত করে, মনীষী ব্যক্তিদের মনেরও থাকে তেমনই ধারণশক্তি। তাঁদের বুদ্ধি কখনও বিচলিত হয় না, দিকভ্রষ্ট হয় না, সর্বদা তা সঠিক লক্ষ্যাভিমুখী থাকে। মনীষীগণ কখনও গতানুগতিক চিন্তার অনুসারী বা চলতি হাওয়াপন্থী হন না। আবার অনন্য হওয়ার অভিলাষে তাঁরা উন্মার্গগামিতাকে প্রশ্রয় দেন না, নৈরাজ্যিক উল্টো হাওয়ায় পথ চলেন না, উদ্ভটত্বের চর্চা করেন না। প্রকৃত মনীষী যিনি, তিনি ঐতিহ্যকে বাতিল করে একান্ত মৌলিক হাস্যকর প্রয়াসে যেমন ব্রতী হন না, তেমনি ঐতিহ্যের অনুবর্তনেও তিনি উৎসাহী নন। নেতিবাচক ঐতিহ্যকে তিনি বর্জন করেন, এবং ইতিবাচক ঐতিহ্যকে গ্রহণ করে তাঁর নবায়ন ও সম্প্রসারণ ঘটান। ঐতিহ্যের গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে মনীষী ব্যক্তিরাই মানুষের মননের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান, পূর্বজ মনীষীদের সুকৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেন, এবং এভাবেই মানব-মনীষার প্রবহমানতাকে রক্ষা করেন।
এ-রকম মনীষীর জন্ম কোথাও কখনও শতে-বিশতে তো নয়ই, এমন কি গণ্ডায় গণ্ডায়ও হয় না। আবার বিরলপ্রজ মনীষীদের কেউ কেউ কখনও কখনও জনগণের কাছে অপরিচিতই থেকে যান, জীবিতকালে তাঁদের কৃতি বহুজনের কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছালেও সে-কৃতির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। সম্ভব হয়নি ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও।
ধীরেন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন খুলনার এক গ্রামে, ১৯১১ সালের ২৫ ডিসেম্বর। আর প্রায় সমস্ত জীবন কলকাতায় কাটিয়ে সেই কলকাতাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ৮৮ বছর বয়সে, ২১ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে। ধীরেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ছোট একটি পরিচিতিমূলক নিবন্ধে তাঁরই গুণগ্রাহী বুদ্ধিজীবী শ্রীরামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য লিখেছেন—ধীরেন্দ্রনাথ ছিলেন বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্র। দেশের কাজের সঙ্গে অর্জিত কাজকে মেলাতে চাইতেন তিনি। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলতেন: সবদিক থেকে দেশকে স্বনির্ভর হতে হবে। এ লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে গুঁড়ো দুধ তৈরি শেখার জন্য ধীরেন্দ্রনাথ পাড়ি দিলেন অস্ট্রেলিয়ায়।
এখানেই দিক পরিবর্তন হল তাঁর জীবনে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬। মারা গেলেন ইভান পেত্রোভিচ পাভলভ। তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকার জন্য অস্ট্রেলিয়া হয়ে সোভিয়েত-যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছিলেন ডা. নর্মান বেথুন (বীটন)—চিনের বিপ্লবী বাহিনীর চিকিৎসাসঙ্গী, স্ক্যালপেলই যাঁর তলোয়ার। যে বাড়িতে পেয়িংগেস্ট হয়ে থাকতেন ধীরেন্দ্রনাথ, সেখানেই উঠেছিলেন ডা. বেথুন। বাড়ির লোকের কাছেই ধীরেন্দ্রনাথ শুনলেন বেথুন ও পাভলভের কথা। তার আগে এ বিষয়ে তাঁর বিশেষ কোনো ধারণা ছিল না। পাভলভ-এর নির্বাচিত রচনাবলীর (ইংরেজি তর্জমা) একটি কপি ফেলে লেনিনগ্রাদে চলে গেছেন ডা. বেথুন।
ধীরেন্দ্রনাথের জীবনের লক্ষ্য বদলে গেল। কলকাতায় ফিরে তিনি শিখলেন রুশ ভাষা, সোভিয়েত দূতাবাসের সাহায্যে জোগাড় হলো পাভলভ-এর রচনাসংগ্রহ। এভাবেই নেহাতই ঘটনাচক্রে ডা. গাঙ্গুলি হয়ে উঠলেন মনোরোগ চিকিৎসক।
হ্যাঁ, ডাক্তার গাঙ্গুলির—মানে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের—সাধারণ পরিচয় মনোরোগ চিকিৎসকই। কিন্তু এই সাধারণ পরিচয় তাঁর আসল পরিচয়ের প্রায় কিছুই প্রকাশ করে না। দেহরোগ চিকিৎসকদের তুলনায় মনোরোগ চিকিৎসকরা সংখ্যালঘু অবশ্যই। এই সংখ্যালঘুদের মধ্যেও একান্ত বিশিষ্ট ও ব্যতিক্রমী ছিলেন ডাক্তার ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর চিকিৎসার নীতি ও পদ্ধতি ছিল অন্য চিকিৎসকদের থেকে প্রায় সবদিক থেকেই স্বতন্ত্র, গতানুগতিক ধারার বাইরে ছিল তাঁর অবস্থান। অর্থাৎ ধীরেন্দ্রনাথের চিকিৎসা চিন্তায় ছিল প্রাতিস্বিকতা ও মৌলিকতা। সনিষ্ঠ পাভলভচর্চার মধ্য দিয়েই সেই মৌলিকতা তিনি অর্জন করেছিলেন। সে মৌলিকতা শুধু তাঁর চিকিৎসা চিন্তার মধ্যেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments