ঢাকার হুক্কা, পান ও চা
প্রাচীনকাল থেকেই পান হিন্দুস্থানের শোভা এবং নামসমূহের মধ্যে 'বাংলা পান', বাংলার বিশিষ্টতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলা পান যদিও বড় হয় এবং একটা পানেই গাল ভরে যায় কিন্তু তাতে কোনো সৌন্দর্য নেই এবং এই পানের ঝাঁঝ কোনো কোনো ঋতুতে অসহনীয় হয়ে যায়। পানের একটি প্রকার যাকে সাঁচি পান বলা হয় এটি অবশ্য নরম, ঝাঁঝ কম এবং স্বাদের দিক থেকেও ভাল, কিছুটা হলেও সুগন্ধি আছে। বাংলায় সর্বত্রই কম বেশি সাঁচি পান পাওয়া যায় এবং বিশিষ্ট লোকেরা এটিকে ব্যবহার করেন। এ কারণেই এখানকার একটি বাজারের নাম 'সাঁচি পান দরীবা", যা এখন বাজার নেই বরং মহল্লা হয়ে গেছে। এই পানের প্রকৃতি ঠাণ্ডা, এজন্য সর্দিকাতুরে লোকদের কাশি সৃষ্টি করে। বাংলার প্রাচীন পাঠান বাদশাহদের সময় থেকে সোনারগাঁয়ের কাফুরী পান খুব প্রসিদ্ধ ছিল। এগুলি ছোট ছোট, পাতলা অথচ মচমচে পান হতো, খুবই সুগন্ধযুক্ত। এই পান সোনারগাঁও থেকে দূর-দূরান্তে উপহার হিসাবে পাঠানো হতো এবং শুধুমাত্র কবি হাফিজের প্রশংসিত সুলতান গিয়াস উদ্দীনের রাজধানী সোনারগাঁয়েই উৎপন্ন হতো। কিন্তু আফসোস ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ভীষণ সাইক্লোনের ফলে এই পানের সমস্ত চারা নষ্ট হয়ে যায় এবং এখন একেবারেই দুষ্প্রাপ্য এবং বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শোনা গেছে যে, কোনো এক সৌখিন ব্যক্তি নিজের বাড়িতে এর একটি চারা কোনোভাবে সংরক্ষণ করেছেন। আল্লা করুন এ সংবাদ যেন সত্য হয় এবং এভাবে পানের এই উত্তম প্রজাতি যেন জীবিত থেকে যায়।
সাধারণভাবে এখানে বাংলা পানই খাওয়া হয় কিন্তু বাংলা পানের অনুরূপ আরও একটি পান হয়, যার জন্মভূমি এই জেলার একটি প্রসিদ্ধ স্থান ঘোড়াশাল। এ পান সবদিক দিয়ে ভাল এবং সম্ভবত ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল গ্রামের পানের জাত থেকে উৎপন্ন। আরো এক ধরনের পান আছে যাকে গাছ পান বলে। লোকেরা এটি বাগানে বা বাড়িতে লাগায় এবং লতা অনেক লম্বা হয় এবং অধিকাংশ অন্য গাছে চড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি খুব সুগন্ধি পান কিন্তু বড় দেরীতে বৃদ্ধি পায়, এ জন্য ব্যবসার যোগ্য নয়।
পান ব্যবহারের তিনটি প্রয়োজনীয় অংশ খয়ের, চুন এবং সুপারি। খয়ের বাংলার নিকটবর্তী জেলা থেকে আসে এবং সাধারণভাবে তিন ধরনের খয়ের ব্যবহৃত হয়। গ্রামে পাখরা খয়ের, যাকে হিন্দুস্থানে পাপড়িয়া বলে, ব্যবহার করা হয়। কালো খয়ের, যা শহরবাসীরা বেশি ব্যবহার করে। এর উত্তম প্রকার হচ্ছে সেই লাল খয়ের যাকে এখানে জনকপুরী বলা হয় এবং এটিই হচ্ছে তৃতীয় প্রকার, এগুলি বাড়িতে ব্যবহৃত হয়। পানের আর এক অংশ চুন। আমাদের এখানে দুই প্রকার চুন হয়ে থাকে। পাথরের চুন, অধিকাংশ সিলেট অথবা কাছাড়ের দিক থেকে আসে, কিন্তু ত্রিপুরা, নোয়াখালী, চিটাগাং এবং ঢাকা ফরিদপুরের যে অংশ এসমস্ত জেলা সংলগ্ন সেখানে ঝিনুকের চুন ব্যবহার করা হয়। হেকিমী দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুনই উত্তম কিন্তু আমরা শহরবাসীরা কদাচিৎ ঝিনুকের চুন ব্যবহার করে থাকি। পানের তৃতীয় অংশ সুপারি। ঢাকার কালিগঞ্জ, রূপগঞ্জ ইত্যাদি থানায় কিছু উৎপন্ন হয় কিন্তু এতটা নয় যে বিক্রির জন্য বাজারে আসবে। বরিশাল এবং নোয়াখালী জেলা থেকে সুপারি আসে, এরও কয়েকটি প্রকারভেদ আছে। বড় সুপারিকে 'জাহাজী' বলে। এক প্রকারকে 'মণ্ডয়া' বলে। এগুলো কাঁচা সুপারিকে দুধে জাল দিয়ে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়। যেহেতু এই কাজ মগ জাতীয় লোকেরা করে থাকে এজন্য সুপারির নাম মগওয়া। মগ মূলত বার্মার অধিবাসী কিন্তু অনেক আগে থেকে বরিশাল জেলার সুন্দরবন এলাকায় বসবাস করে। এই সকল মগদের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে ঢাকার মগবাজার ও মগটুলি রয়েছে। মগওলা সুপারিকে দক্ষিণের ক্রেতারা নিয়ে যায় এবং তাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে চিকনি টুকরা বানায়। মগওয়া সুপারি বিশিষ্ট লোকেরা ব্যবহার করে থাকেন।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments