সে পথ দিয়ে ফিরবে নাকো তারা
“If there is a tree in Spain tinged with blood, It is the tree of liberty.If there is one mouth left to speak in Spain.It speaks of liberty.”—Paul Eluard
ঘটনাস্থল মাদ্রিদ—স্পেনের রাজধানী। সময় ১৯৩৬ সালের ১৮ই জুলাই। প্রভাতী সংবাদের ঘোষকের কণ্ঠে রটে গেল সেই কালান্তক খবর-উপনিবেশ মরক্কোর সৈন্যবাহিনী স্পেনের লোকায়ত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে—স্পেনের প্রতিটি শান্তির নীড়কে গুঁড়িয়ে দেবার আয়োজনে বিপুল বেগে ছুটে আসছে তারা। সমগ্র স্পেন স্তব্ধ নিশ্চল। সরকারের মধ্যে যারা দাক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়া আর ফ্যাসিবাদের বিপদকে এতকাল সর্বপ্রকার সাবধানবাণী সত্ত্বেও নির্বোধ আলস্যে তাচ্ছিল্য করেছে তারা বিমূঢ়। ক্ষেতে-প্রান্তরে, কলে-কারখানায় সর্বত্রই প্রতিটি স্বাধীনতাকামীর মূক কিন্তু দুর্মর আশা-আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দাও, রক্তের নদীতে পিচ্ছিল করব শত্রুর পথ। কিন্তু নির্বাক বিহ্বল কর্তৃপক্ষ তখনও স্থির নিশ্চয় নন নিজেদের সম্পর্কেই।
সেই বিপুল অন্ধকারে বিপদের ঝড় ছুটে আসছিল অনির্বার গতিতে আর প্রতিটি হৃৎস্পন্দন বুঝি থেমে গিয়েছিল চোখের সামনে অতলস্পর্শী খাদের কিনারা দেখে। অকস্মাৎ কখন সেই বিপুল আত্মমগ্নতার পাথার ভেঙ্গে একটি কণ্ঠস্বর সমগ্র স্পেনের প্রান্তর থেকে আকাশ পর্যন্ত, সমুদ্রতীর থেকে পর্বত প্রান্তবর্তী গ্রামের খামার অবধি জনচেতনার নৈস্তব্দাকে বিদ্যুৎসঞ্চারী উজ্জীবন মন্ত্রে সচকিত করে তুলল-‘No pasaran!’—They shall not pass, ফ্যাসিবাদ আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধকে অতিক্রম করতে পারবে না।
সেই আঠারোই জুলাই-এর সান্ধ্য বেতার বক্তৃতায় মাদ্রিদের বেতার ভবন থেকে ক্ষুদ্রতম জনপদের একতম ব্যক্তিটি পর্যন্ত আশায়, বিশ্বাসে প্রচণ্ড তরঙ্গভঙ্গে আছড়ে পড়ল শত্রুর ওপর-সেদিন থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত দীর্ঘ দিন মাস-বছরগুলি ঐ মন্ত্র প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধবাদীদের মৃত্যুধ্বনি হয়ে বেজেছে প্রতি মুহূর্তে।
যে কণ্ঠস্বরটি সেদিন সমগ্র জাতির, বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতার ঋত্বিকদের কণ্ঠস্বর হয়েছিল, সে কণ্ঠস্বরে সমগ্র বিশ্বের বিবেক ঘুম ভেঙ্গে জেগেছিল মহামানদের মিলনক্ষেত্র স্পেনের রণক্ষেত্রে, যে কণ্ঠস্বরের আহ্বানে লক্ষ প্রাণ ছুটে এসেছিল মুক্তির মিছিল হয়ে সেই কণ্ঠস্বরের অধিকারিণী কমিউনিস্ট নেত্রী দলোরেস ইবারুবি—সেদিন তিনি সমগ্র স্পেন হয়ে উঠেছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে দলোরেস ছিলেন শ্রমিকের কন্যা। শুধু যে তার পিতামহ, পিতা, ভ্রাতা সকলেই খনিতে কাজ করে জীবনধারন করেছেন তাই নয়, বিবাহ পূর্ববর্তী জীবনে তাঁর মাও কাজ করতেন লোহার খনিতেই। ১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতার্ত দিনে তিনি প্রথম চোখ মেলে পৃথিবীকে দেখেছিলেন। তাঁর জন্মস্থান, উত্তর স্পেন যেখানে তরঙ্গ-উত্তাল বিস্কে উপসাগরের দিকে নেমে এসেছে সেই বাস্ক প্রদেশের খনি-সহর গালার্তা-য়। এখানে কেবল স্বরণাতীত কাল ধরে সঞ্চিত লোহা-স্পেন রাজকোষের সোনা। আকর লোহার মতই রুক্ষ আর বিস্কে উপসাগরের তরঙ্গমালার মতই ক্ষুদ্ধ ছিল বাস্ক-বাসিরা।
য়োরোপের অন্যান্য অঞ্চল যখন শিল্পবিপ্লবের পথ ধরে প্রচণ্ড বেগে দৌড়চ্ছে, তখন স্পেনের শিল্পবিকাশের সবে প্রভাত। বাস্কের লোহা, আর আশপাশের পারদ, সীসা, তামা, দস্তার লোভ দলোরেসের জন্মের সময় অর্থাৎ উনিশ শতকের সেই শেষ দশকে লোভের হাতছানি দিয়ে ডেকে এনেছে দেশী-বিদেশী শিল্প-পুঁজিপতিদের। সেই ভাঙ্গাগড়ার দিনগুলির শব্দমুখরতায় কেটেছে দলোরেসের শৈশব। তিনি শুনেছেন ফেলে আসা শত-শতাব্দীর সঙ্গে বন্ধনের ছেঁড়া তারের ক্রন্দন, অথচ গড়ার মধ্যে না ছিল শ্রী না ছাঁদ। আসলে লুণ্ঠনের সঙ্গে তো সুন্দরের চিরকালের বৈরিতা। শিল্প-উৎপাদনের সামাজিকীকরণ যত ত্বরান্বিত হচ্ছিল ততই অগ্রগামী শ্রমিকশ্রেণীও গড়ে উঠছিল—যদিও তখনও তারা ছিল প্রায়-অসংগঠিত।
মুখে কথা ফুটতে ফুটতে দলোরেস গিয়েছে পাঠশালায় এবং আরো একটু বড় হয়ে স্কুলে। এই যাওয়াটা যতটা না ছিল পড়াশুনোর চাহিদায় তারও চেয়ে বেশী বাড়তি রোজগারের আশায়। ১৯১০ সালে ১৫ বছর বয়সে স্কুলের পড়া সাঙ্গ করেছে। দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য কাজে যোগ না দিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিতে গিয়েছেন। কিন্তু চৌদ্দ ঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে নিত্য খাবার জোটানো যাদের দুস্কর তাদের পক্ষে সেটা ছিল বিলাসিতা। অতএব পড়াশুনো ছেড়ে শিখেছেন পোষাক তৈরীর কাজ আর ২০ বছর বয়স পর্যন্ত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments