পরিচয়ের রাজনীতি : উত্থান ও আত্মবিরোধ
সাম্প্রতিককালে বহুল আলোচিত বিষয় হলো ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ (Identity Politics)। অনেকেই এই শব্দটি সম্পর্কে আগে থেকেই কিছুটা অবগত। কারণ অনেক বিতর্ক, বিশেষ করে জাতি, লিঙ্গ এবং যৌনতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো, পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্সের ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। পরিচয়ের রাজনীতি এমন অনেক বিতর্কে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যাতে—অনেকেই মনে করতে পারে যে বামপন্থী রাজনীতি মানেই পরিচয়ের রাজনীতি, আর পরিচয়ের রাজনীতিই যেন বামপন্থী রাজনীতির পুরোটা। কিন্তু সত্যি বলতে, ব্যাপারটা এমন নয়।
ঐতিহ্যবাহী বামপন্থী রাজনীতি ছিল শ্রেণি রাজনীতির (Class Politics) ওপর ভিত্তি করে। কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্রী ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে বড় গণসংগঠন তৈরি করত। এর পেছনের ধারণা ছিল সব জাতি, ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়ের মানুষ এই সংগঠনের পতাকাতলে একত্রিত হয়ে পুঁজিবাদকে উৎখাত করতে বা অন্তত পুঁজিবাদে সংস্কার আনতে সাহায্য করবে। এই রাজনীতি গড়ে উঠেছিল একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি ঘিরে—যার চারপাশে বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষ একত্রিত হতো, দলকে এগিয়ে নিত, তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করত। উদারপন্থি রাজনীতি এবং বাম রাজনীতি—উভয়ের ক্ষেত্রেই এমনটাই ছিল মূল কাঠামো।
১৯৮০-এর দশকে পরিচয়ের রাজনীতির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জাতি, ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়ের মানুষের ঐক্যভিত্তিক মতাদর্শগত রাজনীতির অগ্রযাত্রায় কিছুটা ছেদ পড়ে। কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ, কর্মসূচি বা চিন্তাধারার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের বদলে, মানুষ কিছু নির্দিষ্ট পরিচয়ের ভিত্তিতে সংগঠিত হতে শুরু করে। এই পরিচয়গুলো ছিল বয়স, ধর্ম, শ্রেণি, পেশা, সংস্কৃতি, প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষা, বর্ণ (Race), জাতিসত্তা, ভাষা, লিঙ্গ, জেন্ডার, পেশা, যৌন প্রবৃত্তি, শহর বা গ্রামের অধিবাসী, ইত্যাদি। আর এই ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার হয়েছিল ১৯৭৮ সালে কম্বাহি রিভার কালেকটিভে (Combahee River Collective)। আর তখন থেকেই এটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রোন্যাল্ড রিগ্যান ও যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার ক্ষমতায় এসে জাতীয় পর্যায়ে নানা নব্য-উদারপন্থী সংস্কার (Neoliberal Reforms) বাস্তবায়ন করছিলেন। সেই সময়ে কল্যাণ রাষ্ট্রের ব্যবস্থা (Welfare State) ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছিল। সে সময়ে ইউরোপের বামপন্থিরা বেশিরভাগ জায়গায় কল্যাণ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। আর তারা এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার আসল কারণ এটা নয় যে, তারা রক্ষণশীলদের দ্বারা পরাভূত হয়েছিল। বরং বামপন্থিদের নিজেদের মধ্যে ভাঙ্গনই এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারার মূল কারণ। এই ভাঙনের পেছনে ছিল একাডেমিক পর্যায়ে পোস্টমডার্নিজম (Postmodernism) ও পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের (Post-structuralism) উত্থান, যা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে রাজনীতির মাঠে পরিচয় রাজনীতি এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করছিল।
পরিচয়ের রাজনীতি (Identity Politics) মূলত দলভিত্তিক রাজনীতির (Party-based Politics) সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না। দলভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে তারা পরিচিতিভিত্তিক (Identity-based) এবং ইস্যুভিত্তিক (Issue-based) রাজনীতি করতে চায়। অর্থাৎ, তারা কাজ করবে যেমন—লিঙ্গের প্রশ্নে, জাতিগত প্রশ্নে, যৌন পরিচয়ের প্রশ্নে, ল্যাটিন আমেরিকার জনগোষ্ঠীর প্রশ্নে, ভাষাগত প্রশ্নে—যে পরিচয়ই হোক না কেন। কিন্তু তারা রাজনৈতিক দল গঠন করবে না; বরং গঠন করবে তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র সংগঠন বা সামাজিক আন্দোলন (Social Movements), যা নির্দিষ্ট কোনো পরিচিতির ভিত্তিতে মানুষকে সংগঠিত করবে—সমগ্র সমাজের জন্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কর্মসূচির ভিত্তিতে নয়।
আর এই ক্ষেত্রে, তারা স্পষ্টতই কেবল সেই নির্দিষ্ট ইস্যুতে একমত ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। তাই এটিকে ‘ইস্যুভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন’ও বলা যেতে পারে। অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন যে—এগুলোকে রাজনৈতিক আন্দোলন বলা ঠিক নয়, বরং এগুলো ছিল সমাজের নির্দিষ্ট অংশের দাবি ও স্বার্থ নিয়ে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন।
পরিচয়ের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—এটি শ্রেণি (Class)-এর বাইরে আরও অনেকগুলো নতুন পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি করে, যেগুলোর ভিত্তিতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments