জনবোধ্য বিজ্ঞান
বিজ্ঞানকে আমরা সাধারণভাবে নির্বাচিত বিশেষজ্ঞের জ্ঞান বলে জানি যা সুশৃঙ্খল, সুবিন্যস্ত, প্রমাণসাধ্য ও নির্ভুল বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞানের ভাষা প্রায়শঃ গাণিতিক, বিমূর্ত ও জটিল। পারিভাষিক শব্দ, নানা সূত্র-সংকেত বিজ্ঞানকে সাধারণ্যে বোধের অতীত করে রাখে। এর ফলে বিজ্ঞান সম্পর্কে একটি ভীতি এবং সেইসঙ্গে এক ধরনের অন্ধ সমীহ সাধারণ মানুষ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু বিজ্ঞান কোনো প্রশ্নাতীত অন্ধবিশ্বাসের বিষয় নয়। বিজ্ঞানের তথ্য, বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত সূত্র বা নিয়মাবলী অপরিবর্তীত, নির্ভুল বা পরম বলে ভাববার কোনো কারণ নেই। আধুনিক বিজ্ঞান সাধারণের বোধের অতীত মনে হলেও বিজ্ঞানের তথ্য ও তত্ত্ব ক্রমাগত বিকাশ লাভ করে বর্তমানের স্তরে উপনীত হয়েছে। দীর্ঘসময় ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অভিজ্ঞতার সঞ্চয় পরিশোধন ও রূপান্তরের ভিতর দিয়ে যে উপলব্ধি ও অভিজ্ঞান বিজ্ঞানীরা অর্জন করেছেন তা যে সাধারণের কাছে দুর্বোধ্য ও জটিল মনে হয় তার কারণ বিজ্ঞানের ভাষা ও এর যৌক্তিক স্তরগুলো হঠাৎ করে অবধারণ করা সম্ভব নয় সাধারণ মানুষের পক্ষে। আমরা ভুলে যাই যে, যে গতানুগতিক দৈনন্দিন ভাষায় আমরা কথা বলি ও অভিমত প্রকাশ করি তা কত দীর্ঘসময় ধরে অজস্রবার পুনরাবৃত্তি করে এবং ক্রমাগত ভুল সংশোধন করে আমরা তা অর্জন করি।
আমাদের প্রায় অবচেতনায় অনবরত দীর্ঘসময় ধরে সাধারণ ভাষায় কথোপকথনের একটি প্রভাবের মধ্যে নিমজ্জিত থেকে আমরা ভাষা শিখি। সাধারণ ভাষা এবং প্রচলিত ধ্যানধারণা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হবার কারণ হলো, আমরা সবাই প্রায় সর্বক্ষণ কতকগুলো সহজ অভিজ্ঞতার মধ্যে বাস করি। একজন বিজ্ঞানী যে পরিমাণ সময় তার নির্বাচিত জ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যয় করে, সে তুলনায় একজন সাধারণ মানুষ অনেক অল্পসময় বিনিয়োগ করতে সক্ষম সে বিষয়টি জানতে। এছাড়া বিজ্ঞানের উপলব্ধি ক্রমসঞ্চিত ও যৌক্তিকভাবে বিন্যস্ত হবার ফলে একধরনের শৃঙ্খলা ও মনোযোগ এক্ষেত্রে প্রয়োজন। আমরা যখন সমতলভূমিতে চলি তখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও গভীর মনোনিবেশের প্রয়োজন দেখা দেয় না। কিন্তু ক্রমাগতভাবে উচ্চতাপ্রাপ্ত কোনো পর্বতশৃঙ্গে উঠতে হলে সাবধানতা, মনোযোগ ও অপেক্ষাকৃত বেশি শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়। আমাদের সাধারণ জীবনযাত্রায় যে তথ্যগুলো আমরা লাভ করি তা অবিন্যস্ত বলে প্রায় সমতলভূমির মতো পরস্পরের পাশাপাশি অবস্থান করে। এই তথ্যগুলো অর্জন করা বা অনুধাবন করা তাই অনেকটা সমতলভূমিতে পথ চলার মতোই।
কিন্তু বিজ্ঞানের তথ্য ও তত্ত্ব একটি যৌক্তিক সিঁড়ি বেয়ে যেন ক্রমাগত ঊর্ধ্বগামী। মানুষ যে অভিজ্ঞতা উপলব্ধি অর্জন করেছে কোনো বিশেষ সময় তাকে ব্যবহার করে আরও সংশোধিত শুদ্ধতর ও গভীরতর জ্ঞান যদি মানুষ অর্জন করতে চায় এবং ক্রমাগতভাবে এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে তার উপলব্ধিকে উত্তরণের ধারায় ঊর্ধ্বগামী করে, তাহলে সেই জ্ঞানের জগৎ মোটেই সমতল থাকে না। অর্থাৎ বিজ্ঞানের জ্ঞান শুধু বিস্তার লাভ করে না, বা পরিমাণের দিক থেকে আয়তন বৃদ্ধি করে না, তা ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়ে গুণগত উত্তরণ লাভ করে।
বিজ্ঞানের জ্ঞান এর উপলব্ধি, তথ্য ও তত্ত্ব, ব্যবহৃত যন্ত্র উদ্ভাবন ক্রমেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারা ও গতানুগতিক অভিজ্ঞতা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। একজন আধুনিক বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা ও উপলব্ধ জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হতে গিয়ে বিজ্ঞানের যে দীর্ঘপথ পরিক্রমা—তার ভিতর দিয়ে পার হতে হয় একজন সাধারণ মানুষকে। এর কারণ, একটি মানবশিশু যখন একবিংশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করে তার উপলব্ধি ও চেতনার জগৎ হাজার হাজার বছর আগের শিশুর স্তরেই থাকে, কিন্তু মাত্র কয়েক বছরে স্কুল ও কলেজের সিঁড়িগুলো পার হয়ে সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে, বা আরও একটু অগ্রসর হয়ে দায়িত্ব নেয় গবেষকের, তখন বিজ্ঞান সভ্যতার সহস্র বছরের অর্জনকে আত্মস্থ করেই তাকে পৌঁছতে হয় জ্ঞানের সীমান্তে। আমাদের সাধারণ জীবনযাত্রা যেখানে সীমিত, আহার-নিদ্রা, চলা-ফেরা, খেলা-ধুলা, আনন্দ-দুঃখ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments