লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন

প্রত্যেককে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক কিন্তু কাউকে বিশ্বাস না করা আরও বেশি বিপজ্জনক।—আব্রাহাম লিংকন

বাঙালি মাত্রেই অপচয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় এ প্রবচনটি উচ্চারণ করে থাকেন—‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন।’ কোনো ধনী আত্মীয়ের ওপর নির্ভর করে কেউ দুহাতে টাকা ওড়ালে আমরা তখন বলি-চিন্তা কী খরচ করে যান, লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। তবে প্রবচনের মানুষটি সম্পর্কে সবাই জানতে আগ্রহী—কে এই গৌরী সেন? এ রকম একজন উদার দানশীল মানুষ আসলেই কি এদেশে ছিলেন? জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ এমন একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন অনেকের ভরসাস্থল। তার কাছে কেউ টাকা চাইলে তিনি ফেরাতেন না, তাকে তিনি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই টাকা দিতেন।

এই লোকটির নাম হচ্ছে গৌরীকান্ত সেন। তার জন্মসাল, স্থান ও পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তিনি ছিলেন ধনী সুবর্ণবণিক বা স্বর্ণব্যবসায়ী।

গৌরীকান্ত সেনের জন্ম হুগলির বালি শহরে (বর্তমানে এই স্থানটি হাওড়ার অন্তর্ভুক্ত)। অনেকে তার জন্ম হুগলির সপ্তগ্রামে বলেও মনে করেন। আবার অনেকে তার জন্ম মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে বলেও ধারণা করে থাকেন। তার বাবার নাম নন্দরাম সেন (কারও মতে হরেকৃষ্ণ মুরলীধর সেন)। তিনি সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। সেখানে কলুটোলা স্ট্রিটের এক বাসায় তিনি ওঠেন। কলকাতায় গিয়ে বৈষ্ণবচরণ শেঠ নামের এক ব্যবসায়ীর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। বৈষ্ণবচরণ শেঠের সাথে মিলে তিনি ব্যবসা চালাতে আরম্ভ করেন। একবার গৌরীকান্ত সেনের নামে বৈষ্ণবচরণ শেঠ সাত নৌকা জিঙ্ক কেনেন। জিঙ্ক বা দস্তা বোঝাই সাতটি নৌকা ঘাটে চলে আসার পর দেখা গেল সাতটি নৌকাই রূপায় ভর্তি। তারা উভয়েই ছিলেন সৎ। যেহেতু নৌকার মাল (দস্তা) গৌরী সেনের নামে কেনা তাই সব মাল অর্থাৎ সাত নৌকা বোঝাই রূপাই তিনি দিয়ে দেন গৌরী সেনকে। ফলে গৌরী সেন হঠাৎ বিরাট সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন। তারপর তিনি বৈষ্ণবচরণ শেঠ থেকে অনুমতি নিয়ে আলাদা হয়ে ব্যবসা আরম্ভ করেন। তিনি ব্যবসা বাড়ানোর মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। কলকাতার আহেরীটোলায় পরে তিনি বিশাল একটি বাড়ি করেছিলেন।

তার উত্তরপুরুষ ছিলেন শম্ভু সেন। শম্ভু সেনের হাত ধরে কলকাতায় আসত বিদেশি পণ্য। শম্ভু সেন আমদানি শুরু করেন লিভার ব্রাদার্সের পণ্য। সেই লিভার ব্রাদার্স এখন হিন্দুস্তান ইউনিলিভার।

ব্যবসার মাধ্যমে গৌরী সেন যতই সম্পদ বাড়াতে থাকেন ততই বেড়ে যেতে থাকে তার দানের উৎসব।

সেকালে দেনার দায়ে কারও জেল হলে ঋণ পরিশোধ না হওয়া অবধি তারা মুক্তি পেত না। দেনার দায়ে অনেককে জেলেই মৃত্যুবরণ করতে হতো। গৌরী সেন তাদের অনেককে মুক্ত করতেন। তাদের বকেয়া রাজকর পরিশোধের জন্য তিনি তাদের টাকা দিতেন। আসলে এর পেছনে মূল ইতিহাসটা এমনই যে, গৌরী সেনের ওপর নির্ভর করে তার আশপাশের মানুষগুলো তাদের যেকোনো প্রয়োজনে তার কাছ থেকে টাকা নিতে পারত।

এই থেকেই এই বাংলা প্রবাদের জন্ম হয়—‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন।’ এই প্রবাদের মধ্য দিয়ে মানুষ আজও এই মহৎ মানুষটিকে স্মরণ করে থাকে।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice