অতীতের সঙ্গে বোঝাপড়া
[বোরহানউদ্দিন খান সম্পাদিত পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র—‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পাকিস্তান’-এর ভূমিকা হিসেবে প্রকাশিত]
II ১ II
অতীতের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে চাই। এই অতীত হচ্ছে পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের পাঁজর ভেঙ্গে বাংলাদেশের আবির্ভাব। বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটেছে যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। পাকিস্তান যুদ্ধ করেছে বাংলাদেশকে ঔপনিবেশিকতার মধ্যে কবজা করে রাখার জন্য। বাংলাদেশ যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানের কবজা ভাঙ্গার জন্য। সেজন্য এই যুদ্ধ আমার দিক থেকে নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই: পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোসর জামাতে ইসলাম, আলবদর রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এর মধ্যে কোন দ্বিধা নেই এবং দ্বন্দ্ব নেই। এই হচ্ছে ইতিহাসবোধ। এই বোধ বাদ দিয়ে অতীতের সঙ্গে কি বোঝাপড়া সম্ভব? অতীতের দিকে তাকানো সম্ভব?
অতীতের দিকে তাকানোর অর্থ হচ্ছে ইতিহাস বোধ তৈরি করা। সব অতীত থেকে ইতিহাস হয় না, ইতিহাস হয় যুক্ততা থেকে; আমি, একজন ব্যক্তি কিংবা আমরা, একটি জনসমষ্টি যে-অর্থে একটি সময়ের সঙ্গে যুক্ত। এই যুক্ততা আমার জন্য কিংবা আমাদের জন্য কতটুকু অর্থবহ। অর্থবহতা বাদ দিয়ে ইতিহাস হয় না এবং ইতিহাসের মধ্যে অর্থবহতা না থাকলে অতীত হয় না। সেজন্য বর্তমান থেকে আমি পিছনে তাকাতে চাই: যখন পাকিস্তান ভেঙ্গে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটছে।
পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান ঘটেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র আভ্যন্তরীণ উপনিবেশ রক্ষার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে এবং সামরিক শক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যা সংগঠিত করেছে। এই গণহত্যার স্বরূপ দুটি। প্রথমত এই গণহত্যার শিকার প্রধানত নিরস্ত্র জনসাধারণ; দ্বিতীয়ত এই গণহত্যার শিকার ‘একই রাষ্ট্রের বাসিন্দারা। সেজন্য পাকিস্তানের এই সামরিক অভিযানের দুই দিক: এই অভিযান ঔপনিবেশিক সন্ত্রাসের চূড়ান্ত ঐতিহাসিক মুহূর্ত, অন্যপক্ষে এই অভিযানে নগ্ন এবং উন্মোচিত নৈতিকতার মুহূর্ত। এই দুই মুহূর্ত পরস্পর প্রবিষ্ট, এই পরস্পর প্রবিষ্টতার মধ্যে ক্রিয়াশীল বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক অতীত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বরূপ; অন্যপক্ষে এই অতীতে ক্রিয়াশীল জাতিক লাঞ্ছনা, শোষণ, অধস্তনতা এবং নৈতিকতা। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের এই ঔপনিবেশিকতা উৎসারিত অতীত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, অন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বরূপ, যে-স্বরূপে নগ্ন এবং উন্মীলিত পাকিস্তানের মতাদর্শিক নৈতিকতা। পাকিস্তানের মতাদর্শিক নৈতিকতার ফ্রেম তৈরি হয়েছে ইসলাম থেকে এবং মতাদর্শিক ইসলাম ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশে জাতিক লাঞ্ছনা, অপমান এবং অধস্তনতা বৈধ করার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব প্রসঙ্গ জরুরী ঐতিহাসিক আকর।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক এবং মতাদর্শিক সহযোগীরা: প্রধানত জামাতে ইসলাম এবং তার অঙ্গ সংগঠন বর্তমানে বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক এবং মতাদর্শিক সহযোগীদের মধ্যে পাকিস্তান আমলের পূর্বতন চিন্তা এবং কর্ম অব্যাহত। বাংলাদেশে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচ্ছেদ রয়েছে কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক এবং মতাদর্শিক সহযোগীরা বাংলাদেশের বর্তমানে বাসিন্দা। তাদের পূর্বতন চিন্তা এবং কর্ম ও বর্তমান চিন্তা এবং কর্ম অভিন্ন। মতাদর্শের দিক থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের এরা বাসিন্দা এবং কর্ম তৎপরতার দিক থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উচ্ছেদ প্রয়াসী। পাকিস্তানের মতাদর্শিক উপাদান: ইসলাম এবং ধর্ম-ইসলামের মধ্যে ব্যবধান যুগান্তরের। বাংলাদেশে পূর্বতন পাকিস্তানের সামরিক এবং মতাদর্শিক সহযোগীরা পাকিস্তানের মতাদর্শিক ইসলাম ব্যবহার করেছে এবং ব্যবহার করার মধ্যে দিয়ে ধর্ম-ইসলাম এবং মতাদর্শিক ইসলামের ব্যবহারের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি করেছে এবং পার্থক্য তৈরি করে বাংলাদেশে জামাতী ইসলাম এবং অ-জামাতী ইসলামের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করছে। অন্যপক্ষে মতাদর্শিক ইসলাম ব্যবহার করে ঔপনিবেশিক আমলে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে জামাতীরা বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন ধারণা তৈরি করার চেষ্ট করছে; এই ভিন্ন ধারণার মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে তাদের বাঙালি জনসাধারণ হত্যা এবং বাঙালি জনসাধারণ বিরোধী ভূমিকা অস্বীকার এবং অবজ্ঞা করার চেষ্টা করছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে তাদের গণহত্যা এবং
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments