‘মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী বন্ধুরা’
১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় আসে বাংলাদেশে। বিজয়ের এই অলৌকিক আনন্দের মূল্য ছিলো মহান আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম আর অসীম সাহসের এক অনুপম সমাবেশ। দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে মুক্তিযুদ্ধ...বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। আর এর পেছনে দেশের অগণিত মানুষের ভূমিকাকে যেমন খাঁটো করে দেখা যাবে না, তেমনি খাটো করা যাবে না এদেশে জন্ম নয় এমন কিছু মানুষের অবদানও। জন্মগতভাবে বিদেশী হলেও, দেশের সেই অক্লান্ত সংগ্রামের সময়ে তারা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অপার মমতায়।
তাদের কেউ লড়েছেন শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, কেউ বা কূটনৈতিক ভাবে, কেউ বা আবার হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। স্বাধীনতার ৪৪তম বার্ষিকীতে আমরা বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই লাল-সবুজের সেইসব অকৃত্রিম বন্ধুদের। আমি সংক্ষিপ্তভাবে সেইসব বন্ধুদের পরিচিতি তুলে ধরছি:
উইলিয়াম এ এস ওডারল্যান্ড (জন্ম: ৬ ডিসেম্বর, ১৯১৭–মৃত্যু: ১৮ মে, ২০০১)
বাংলাদেশের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবদান রাখা বিদেশীদের মধ্যে অন্যতম ব্যতিক্রম ব্যক্তি হলেন উইলিয়াম এ এস ওডারল্যান্ড। সামনা-সামনি যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা রাখবার জন্য তাকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীর প্রতীক প্রদান করেন। তিনি এই খেতাব-প্রাপ্ত একমাত্র বিদেশী। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বাটা সু কোম্পানিতে চাকুরির সুবাদে বাংলাদেশের যে কোন স্থানে তাঁর ছিল অবাধ যাতায়াত। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২২ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল সুলতানের সঙ্গে প্রথমে এবং এরপর একে একে সেনাবাহিনীর আরো কয়েকজনের সঙ্গে সখ্য জমিয়ে ফেলেন তিনি। এ সুযোগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব ধরনের নিরাপত্তা পাস পেয়ে যান। অবাধ মেলামেশার সুযোগে সব ধরনের তথ্য, সেনাবাহিনীর তৎপরতা ও পরিকল্পনা গোপনে পাঠাতে থাকেন ২ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে। একই সঙ্গে টঙ্গীর বাটা সু কোম্পানির কারখানা প্রাঙ্গনে স্থাপন করেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোপন ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর কারখানায় আশ্রয় নিয়ে আশেপাশে গিরিলা অপারেশন চালাতে থাকে এবং অস্ত্র সংগ্রহ, চিকিৎসা সামগ্রী, আর্থিক ও প্রশিক্ষণ সাহায্য দিয়েও সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাবেক এই অস্ট্রেলিয়ান যোদ্ধা।
ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (জন্ম: ৭ এপ্রিল, ১৮৯০–মৃত্যু: ২৭ জানুয়ারি, ১৯৭৯)
আর্জেন্টিনার একজন বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী, লেখিকা এবং সাহিত্য সমালোচক। তিনি ল্যাটিন আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী, স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সাহিত্য-পত্রিকা 'সুর' এর প্রতিষ্ঠাতা। একাত্তরে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের সংহতি আন্দোলনের সামনে ছিলেন লেখক, শিল্পী ও ধর্মীয় নেতারা। একাত্তরের ১১ জুন তাঁদের একটি প্রতিনিধিদল আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য সাহায্য পাঠানোর দাবি জানিয়েছিলেন। এই দাবিনামায় যাঁরা স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রথমেই ছিলেন আশি-ঊর্ধ্ব ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর নাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন খ্যাতনামা সাহিত্যিক হোসেলুইস বোর্হেস সহ আর্জেন্টিনার সেরা লেখক ও শিল্পীদের অনেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিজয়া’—ভিক্টোরিয়ার নামের এই বাংলা প্রতিশব্দ করেছিলেন কবি নিজে—ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বাংলাদেশের সমর্থনে রাজধানী বুয়েনস্ এইরেসের একটি মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি আমার সমর্থন অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ বাংলাদেশের মানুষের ভাষা বাংলা। বাংলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও ভাষা। আর তিনি (রবীন্দ্রনাথ) বহু সময় কাটিয়েছেন বাংলার ওই অংশে। সে জন্য এই অঞ্চলের মানুষের সংগ্রামের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ আমার কর্তব্য বলে মনে করেছি।’
আরউইন অ্যালেন গিন্সবার্গ (জন্ম: ৩ জুন, ১৯২৬–মৃত্যু: ৫ এপ্রিল, ১৯৯৭)
কাদামাটি মাখা মানুষের দল/পাদাগাদি হয়ে একসঙ্গে দ্যাখে/আকাশে বসত মরা ঈশ্বর/নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে।—(কণ্ঠশিল্পী মৌসুমি ভৌমিকের বঙ্গানুবাদকৃত গান থেকে)
মার্কিন এই বিখ্যাত কবি ও গীতিকার ১৯৭১ এর ভয়াবহতা দেখেন ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশী শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে দেখবার সময়। বন্ধুত্বের খাতিরে সদ্যপ্রয়াত পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলকাতার বাসায় ওঠেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিককার সময়ে। আরো অনেকের মতোই শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে যাবার পরিকল্পনা করেন তাঁরা—তবে সড়কপথে না গিয়ে, বেছে নেন পানিপথ। নৌকায়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments