পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ
জেসির কান্না পাচ্ছিল। টম-এর আসার অপেক্ষায় সে চালা-ঘরটার মধ্যে বসেছিল, তার জখমী পাটাকে একটু জিরান দেবার সুযোগ পেয়ে বেশ কৃতজ্ঞ বোধ করছিল, শান্তভাবে, উৎফুল্ল মনে সেই মুহূর্তটির প্রত্যাশায় উদগ্রীব হয়েছিল যখন টম বলবে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বটেই তো, জেসি, তুমি তোমার সুবিধা মতো যে কোনো সময় কাজে যোগ দিতে পারো!”
দু’সপ্তাহ ধরে সে নিজেকে ঠেলে নিয়ে এসেছে মিশৌরীর কানসাস সিটি থেকে ওকলাহামার টালসাতে, বৃষ্টিভরা রাত আর সপ্তাহব্যাপী নিদারুণ রৌদ্রদাহের মধ্য দিয়ে, নিদ্রাবিহীন অবস্থায় উপযুক্ত খাবার ছাড়াই শুধুমাত্র এই মুহূর্তটির কল্পনাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর তখনই টম এসে অফিসে ঢুকলো। হাতে তার এক বাণ্ডিল কাগজ নিয়ে সে চট করে এসে ঢুকলো; জেসির দিকে একবার তাকিয়েও ছিল চকিতের জন্য, ঠিকই—তাহলেও চেনার পক্ষে যথেষ্ট দীর্ঘ সময়। সে ওকে চিনতে পারেনি। মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে…আর টম ব্র্যাকেট কিনা তার আপন সম্বন্ধী।
এটা কি তার জামাকাপড়ের জন্য? জেসি জানতো তাকে সাংঘাতিক দেখাচ্ছে। পার্কের একটা জলখাবার ফোয়ারায় নিজেকে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নিতে চেষ্টা করেছিল, তাতে কোন কাজ হয়নি; দাড়ি কামাতে গিয়ে উত্তেজনার বশে গালের একটা পাশ একটু কেটে গেছে, কাটাটা বেশ বিশ্রী ধরনের। তার স্যুট থেকে লাল গাম্বো মাটির ধুলো কিছুতেই আর ঝেড়ে ফেলতে পারেনি যদিও সারা গা চাপড়াতে চাপড়াতে হাত দুটো তার ভেরে গেছে…। না কি তার এতই পরিবর্তন হয়েছে?
পাঁচ বছর তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয় নি ঠিকই; কিন্তু টমকে দেখে তো শুধু মনে হয় পাঁচ বছর বয়সই তার বেড়েছে, আর কিছু নয়। সে তো সেই টমই রয়ে গেছে। ভগবান! তার নিজের কি তাহলে সত্যই এত পরিবর্তন হয়েছে!
ব্র্যাকেট-এর টেলিফোনে কথা বলা শেষ হলো। তার সুইভ্ল (ঘোরানো) চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সে জেসির দিকে তাকালো, তার সন্দিগ্ধ বিরাগভরা ছোট ছোট স্বচ্ছ নীল চোখ তুলে। ভারী গড়নের, ভুঁড়িওয়ালা বছর পঁয়তাল্লিশ বয়সের লোকটি, লালচে বাদামী চুল, গম্ভীর চেহারা; মাংসালো মুখ, মুখাবয়ব বেশ চোখাচোখা, জোরালো, নাকটা গোলাকার, ডগাটা লাল। তাকে দেখে বেশ নির্ভরযোগ্য, সজ্জন, দক্ষ ব্যবসায়ী বলে মনে হয়—অবশ্য সে তো তাই। ঠাণ্ডা নির্লিপ্তভাবে জেসিকে পরীক্ষা করে দেখছিল, তার ওপর সময় ব্যয় করার অনিচ্ছাটা বেশ খোলাখুলি ভাবে দেখিয়ে। এমনকি তার মুখের খড়কে কাঠিটা চিবানোর ধরনটাও জেসির কাছে কেমন যেন তাচ্ছিল্য মাখানো বলে মনে হচ্ছিল।
“কি ব্যাপার?” হঠাৎ ব্র্যাকেট প্রশ্ন করলো। “কি চাও তুমি?”
গলার স্বরটা বেশ ভদ্র এটা জেসিকে স্বীকার করতেই হবে। সে তো এর থেকেও অনেক বেশি খারাপ কিছু আশঙ্কা করেছিল। চালা ঘরটাকে দু-ভাগ করেছে কাঠের যে কাউন্টারটা তার কাছে এগিয়ে গেলো সে। তার জটাপড়া চুলের মধ্যে উদ্বিগ্নভাবে একটা হাত চালিয়ে দিলো।
“মনে হচ্ছে তুমি আমায় চিনতে পারো নি, টম”, সে থেমে থেমে বললো, “আমি জেসি ফুলটন।”
“হিউ?” ব্র্যাকেট বললো। আর তাই সব।
“হাঁ, আমিই সে, এলা তোমাকে তার ভালোবাসা জানিয়েছে।”
ব্র্যাকেট উঠে কাউন্টারের কাছে এগিয়ে এলো, একেবারে দু’জনে মুখোমুখি হযে দাঁড়ালো। বিস্ময়ে সে ফুলটনকে লক্ষ্য করছিল, তার ভগ্নীপতির চেহারার যতটুকু তার মনে ছিল তার সঙ্গে এর মিল খুঁজছিল। এই লোকটা লম্বা, বছর তিরিশ মতো বয়স। সেটা মিলে গেছে। সরল সুন্দর মুখাবয়ব আর ঋজু দোহারা শরীর। সেটাও মিলছে। কিন্তু মুখটা বড়ই শুকিয়ে গেছে, আর ঢলঢলে জামা-কাপড়ের নিচে শরীরটা নেহাৎই অস্থিসার বলে নিশ্চিত হতে পারছে না। ওর ভগ্নীপতি তো ছিল বেশ বলিষ্ঠ, জোয়ান যুবা, বেশ পেশল চেহারা। এ যেন একটা খারাপ ভাবে তোলা বিবর্ণ ফোটোগ্রাফ থেকে বিষয়বস্তুকে চেনার চেষ্টা: মিল আছে ঠিকই কিন্তু অমিল প্রচণ্ড। চোখ পরীক্ষা করে দেখছিল সে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments