গ্যেটে
বিশ্ববিখ্যাত কবি গ্যেটে যে অসাধারণ সৃজন-প্রতিভার অধিকারী ছিলেন সে-কথা বিশেষ করে বলাই নিষ্প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, তিনি দেবদুর্লভ সৌভাগ্যেরও অধিকারী ছিলেন। রূপ, স্বাস্থ্য, সম্পদ, মেধা, বুদ্ধি ও সৃজনপ্রতিভার এমন আশ্চর্য সমন্বয় কদাচিৎ দৃষ্ট হয়। সর্বতোভাবেই তাঁর জীবন ছিল অসাধারণ ও অসামান্য। একেবারে শৈশব হতেই নানাভাবে এর সূত্রপাত দেখা যায়। ছ-সাত বছর বয়সের মধ্যেই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি ও মননশীলতার অদ্ভুত স্ফুরণ হয়। এই বয়সেই তিনি ভগবান, প্রকৃতি ও মানুষের স্বভাব প্রভৃতি জটিল ও গুরুতর বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন। মাত্র আট বছর বয়সের সময় তিনি ক্রীশ্চান ও প্যাগানদের জ্ঞানের তুলনা করে ল্যাটিন ভাষায় এক প্রবন্ধ রচনা করেন। এগারো বছর বয়সের সময় তিনি একটি উপন্যাসই লিখে ফেলেন, এই উপন্যাসটি লিখতে নাকি তাঁর মাতৃভাষা ছাড়া আরো পাঁচ-সাতটি ভাষাজ্ঞানের প্রয়োজন হয়। শুধু তাই নয়, এই অল্প বয়সের মধ্যে তিনি কবিতা রচনা, চিত্রাঙ্কন, নৃত্য, অসিচালনা প্রভৃতিতেও বেশ দক্ষ হয়ে ওঠেন।
বাল্যকাল হতে তাঁর মধ্যে পরিণত মনের লক্ষণও দেখা যায়। এই সময় হতেই তিনি আত্মবিশ্লেষণে অনলস ছিলেন। তার ফলে তাঁর চিত্তের স্বাভাবিক ঔদার্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাঁর অনেক কাজ ও লেখার মধ্যে তা সুন্দরভাবে পরিস্ফুট। মাত্র সতেরো বছর বয়সের সময়ই তিনি সম-অপরাধী নামে যে নাটকটি লেখেন তার উপসংহারে এই মত ব্যক্ত করেন যে আমরা অধিকাংশই যখন নানা অপরাধে অপরাধী তখন অপরের অপরাধ আমাদের ক্ষমা করা ও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করাই উচিত। কৈশোরে রচিত এই নাটকটি অবশ্য সাহিত্য হিসাবে মোটেই উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু সেই যুগে জার্মানীতে মাত্র সতেরো বছরের ছেলের পক্ষে আন্তরিকভাবে এই উদার ও সহৃদয় মনোভাব পোষণ করা সত্যিই কিছুটা বিস্ময়ের বিষয় ছিল।
রেনেসাঁসের মানবতান্ত্রিক সুরটি যেন তাঁর মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। প্রচলিত ন্যায়-নীতির অনেক ঊর্ধ্বে ই যে মানুষের স্থান সে-বিষয়ে সেই অল্প বয়সেই তাঁর মনে কোনো সংশয় ছিল না। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। বাল্যকালে, একবার তাঁর কয়েকজন সহপাঠী তাঁকে উত্তেজিত করার জন্য বলে যে তাঁর পিতা তাঁর পিতামহের পুত্র নন। তিনি অন্য কোনো একজন ধনী ব্যক্তির পুত্র। বলা বাহুল্য এই ধরনের কুশ্রী ইঙ্গিতে যথেষ্ট শিক্ষিত, সংযত ও বয়স্ক ব্যক্তিরও উত্তেজিত হওয়ার কথা। কিন্তু গ্যেটে উত্তেজিত তো হলেনই না, উপরন্তু এর একটি সুন্দর উত্তর দিয়ে সকলের মুখ বন্ধ করে দিলেন। তিনি বললেন,—বেশ তো, যদি তাই সত্যি হয় তাতেও কোনো ক্ষতি নেই। কারণ মানুষের জীবন এমনই এক মহা দান যে কোন্ মানুষের কাছ থেকে তা এসেছে সে-কথা সে না ভেবেও পারে।
বলা নিষ্প্রয়োজন যে গ্যেটে শুধু অসাধারণ কবি ছিলেন না। তাঁর প্রতিভা ছিল বহুমুখী। সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, রাজনীতি সর্বক্ষেত্রেই তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর দেখা গেছে। সাহিত্যেরও সব শাখাতেই যেন তাঁর সমান অধিকার ছিল। গদ্য, পদ্য, কাব্য, নাটক, উপন্যাস সমস্ত কিছুতেই তিনি অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। বিপুল ও বিচিত্র তাঁর রচনাবলী। অবশ্য আমাদের দেশের সাধারণ পাঠকের কাছে তাঁর উপন্যাস ‘তরুণ ভের্টর-এর দুঃখ’, ‘ভিলহেল্ম্ মাইস্টার’ ও তাঁর বিশ্ববিখ্যাত নাটক ‘ফাউস্ট’-এর নামই সমধিক পরিচিত। ফাউস্ট গ্যেটের জীবনের বোধহয় সর্বোত্তম সাহিত্যকর্ম এবং এক বিস্ময়কর সৃষ্টি।
১৭৪৯ খ্রীস্টাব্দের ২৮শে আগাস্ট জার্মানীর ফ্রাঙ্কফোর্ট শহরে গ্যেটের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম হচ্ছে য়োহান ভোল্ফগাঙ গ্যেটে। তাঁর পিতা য়োহান কাস্পার গ্যেটে ফ্রাঙ্কফোর্ট-এর একজন ধনী ও পদস্থ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যথেষ্ট শিক্ষিত ও শিল্পানুরাগীও ছিলেন। বাল্যকালে গ্যেটে বাড়িতেই পড়াশোনা করেন এবং তাঁর অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধির বলে অল্প বয়সের মধ্যেই মাতৃভাষা ছাড়া ইংরেজি, ফরাসী, ল্যাটিন, ইতালীয়, হিব্রু প্রভৃতি আরো অনেকগুলি ভাষাও মোটামুটি আয়ত্ত করে ফেলেন।
ষোলো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments