সবুজ মাঠ
সামনের মাঠটা উঁচু হয়ে উঠে গিয়ে কিছু দূর হতে আবার নেবে গেছে। নেবে গেছে অনেকখানি। এতখানি নেবে গেছে যে, দূরের সুপুরিগাছ দুটোর শুধু আগা দেখা যায় এখান থেকে।
আকাশটা আজ নীল-ঝকঝকে নীল। এবং সে আকাশের তলে সবুজ মাঠটি মানিয়েছে ভালো। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রাবেয়া সেদিকে চেয়ে আছে বটে কিন্তু তাঁর মন নেই সেখানে। নির্দিষ্টভাবে নেই কোথাও, কিন্তু সামনের মাঠটার নেবে-গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে কেমন একটা নীরব উদাসীনতা, তাতে তার মনটা থেকে থেকে বেদনায় ছলছল করে উঠছে।
ওপাশে ইজিচেয়ারে আধ-শোয়া হয়ে আকবর খবর কাগজ পড়ছিল, হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল রাবেয়ার পানে। ক্ষণকাল পরে শুধাল: কী দেখছ অত?
—মাঠ—মাঠ দেখছি গো? একটু থেমে আবার বললে, আচ্ছা, ওই পথ দিয়ে সেদিন আমরা এলাম, না?
হুঁ। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা, তারপর আবার: কিন্তু কেন?
—এমনি। আচ্ছা দেখেছ, এ-দিকের মাঠগুলো কেমন সবুজ? আমাদের ওধারের মাঠগুলো যেন খাঁখাঁ করে। এমন খাঁখাঁ করে যেন মায়া লাগে। পোড়াকপালে মাটি!
আকবর আবার কাগজে চোখ নত করলে, করে হাসল। একটু থেমে বলল: তোমাদের ওধারের জন্যে মনটা শুধু কেমন করে, না?
—যাঃ, তা করবে কেন? এমনি বলছিলাম।
—ভাবি, তাকে আর এখনো ভালোবাসি কি না?... তাকে আমি ভালোবাসি । ...বর্ষণের আওয়াজে আর মোহ নেই। মোহ কেটে গেছে। কোথা হতে একটা পিচ্ছিল সাপ কিলবিল করে উঠল, গর্ত খুঁচিয়ে কে তাকে বার করলে?
তারপর চুপচাপ।
রাবেয়া শুধু চেয়ে-চেয়েই দেখছে। এবার সে দিগন্ত থেকে আকাশে দৃষ্টি তুললে। ওই ওটা কী উড়ছে? শঙ্খচিল? বোধহয়। কেমন ধীরে-ধীরে ওড়ে তারা, দেখে মনে হয় যেন কত ওদের বিদ্যেবুদ্ধি আর বয়স। শ্রদ্ধা হয় দেখে। পাখিকে দেখে তা হলে শ্রদ্ধাও হয় মানুষের। তা হয় বৈকি? শ্রদ্ধাও হয় মায়াও হয়। যেমন চড়ুইগুলোকে দেখে মায়া হয়।
শঙ্খচিল উড়ছে আর উড়ছে। আর চেয়ে দেখছে ধরণীর পানে। দেখছে কি এই মাঠের পানে—সবুজ মাঠের পানে? কে জানে।
রাবেয়ার চোখে ঘোর লেগেছে। এবং সে-চোখের পানে আকবর আবার তাকালে।
—এই।
—উঁ?
—শোন। এস, এ-ধারে এস।
হয়তো রাবেয়ার মনের উদাসীনতা হাওয়া হয়ে ভেসে এসে আকবরের মনে লেগেছে। জানলা দিয়ে দিগন্তের পানে চেয়ে তার মনটাও কেমন করে উঠল। রাবেয়া তখন কাছে এসে বসল, তখন তার চোখের পানে চেয়ে হঠাৎ সে হাসল, হেসে ওর হাতটি ধরে বলল: -জান, ফেলে আসা পথ দেখে আমার মনটাও কেমন যেন হয়ে উঠত। সে অনেক আগে। এখন আর করে না, রোদে-জলে শক্ত হয়ে গেছে সে-সব। ... এই!
—উঁ?
—তাকাও আমার দিকে। কেন, এই যে, আমি চাকরি পেয়েছি, দুজনায় এখানে এসে ছোট সংসার পেতেছি—এসব তোমার কিছু ভালো লাগছে না?
-লাগছে।
---তবু মাঠের পানে চেয়ে মনটা কেমন-কেমন করে ওঠে, না?
তারপর আকাশে কখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, ঝিটা কখন ঘরে আলো দিয়ে গেল, মনের নিবিড় স্তব্ধতার মধ্যে তা তারা জানতে পেলে না। এক সময়ে আকবর চমকে উঠল, হেসে
বলল: দেখেছ?
রাবেয়া চোখ তুলে চাইল।
—আমার চোখে জল।
আকবর বললে তার চোখে জল, সময়, ঘর ও মনোময় এ-বিস্তৃত ও নিবিড় নীরবতার পর আকবর শুধু বললে যে, তার চোখে জল। কিন্তু কেন? কোন সে-ব্যথায় অন্তর-নিংড়ানো এ-জল?
তার উত্তর আকবর নিজেই দিলে।
---জান, এ-দুনিয়ার কত পথ অতিক্রম করেছি, কখনো হয়তো পেছনে ফিরে চেয়েছি কখনো-বা তাকাই নি, সে-সব ফেলে-আসা আবছা হয়ে ওঠা পথের জন্যে আজ চোখে হঠাৎ জল ছেপে এল।
wwwww
তারপর নীরবতা। কিছুক্ষণ সে নীরবতার মধ্যে হঠাৎ একটা হাসির আওয়াজ ফিসফিস করে উঠল।
—হাসছ কেন, এই, হাসছ কেন?
হাসছিল কেন যে,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments