পাকিস্তানের মৌল আদর্শ
যদিচ জগতের রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, জাতীয়তার ভিত্তি প্রধানত ভাষা ও প্রাকৃতিক তথা ভৌগোলিক অখণ্ডতা; এবং ধর্মের ভিত্তিতে সারা য়োরোপে অথবা আফগানিস্থান থেকে মরোক্কো পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়নি, তথাপি দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তারা দাবি করেছিলেন যে, জাতীয়তার প্রধান শর্ত ধর্ম এবং ধর্মের ভিন্নতা জাতীয়তার পার্থক্য ঘটাতে বাধ্য। এই দাবির ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিলো এবং জন্ম হয়েছিলো পাকিস্তান নামক একটি কিম্ভূত রাষ্ট্রের। কিম্ভূত, কেননা, দেড় হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দেশের দুটি অংশ এবং এই দুই অংশের জনগণের ভাষা আলাদা, আলাদা পোশাক-পরিচ্ছদ, শিক্ষা-দীক্ষা, রুচি-রুজি, খাদ্যপানীয়—সংক্ষেপে সংস্কৃতি। ধর্মের ঐক্য ব্যতীত পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের কার্যত কোনো মিল নেই। কিন্তু ইংরেজ রাজত্বকালে ঐতিহাসিক কারণে ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত হয়ে ওঠে এবং তীব্র সাম্প্রদায়িকতার মুখে ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ অনিবার্য হয়ে পড়ে। দেশবিভাগের অব্যবহিত পূর্বে এবং পরে মুসলমানরাও একটা উগ্র ধর্মোন্মত্ততায় আচ্ছন্ন হন। এবং এই নেশা সাময়িককালের জন্যে একটি ধর্মীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত জাতীয়তাবোধেরও বোধহয় জন্ম দিয়েছিলো। ফল-স্বরূপ স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম একটি ইসলামি রাষ্ট্রগঠন নেতা ও সাধারণ মুসলমানদের সর্বাত্মক সংগ্রামের লক্ষ্য হয়ে দাড়ায়। কিন্তু রাজনৈতিক প্লাটফর্মে ধর্মের ধরতাই বুলি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারলেও অথবা তা-ই দিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করা সম্ভব হলেও, তা মানুষের স্থায়ী মূল্যবোধ নির্মাণ করতে পারে না ৷
এ কারণেই দেখি পাকিস্তান সৃষ্টির পরে সে দেশের মানুষের মধ্যে কোনো নবমূল্যবোধ গড়ে ওঠেনি। শিক্ষাসম্প্রসারণ এবং বর্ধিত ও অবাধ অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধার ফল-স্বরূপ অল্পদিনের মধ্যেই সে দেশে, এ যাবৎ অস্তিত্বহীন, একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী জন্মলাভ করে। প্রত্যক্ষ ফলাফল হিশেবে অবশ্য ভূমিহীন কৃষক ও বিত্তহীন পেশাদারদের সংখ্যাও যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। কোনো মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত মূল্যবোধ অর্জনের চেয়ে আপনাপন স্বার্থ ও সৌভাগ্য অর্জনের প্রযত্নই হলো এ সমাজের প্রধান লক্ষ্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণী অনাস্বাদিতপূর্ব প্রাচুর্যের সন্ধান পেয়ে হিন্দুদের প্রতি সহজেই ঈর্ষামুক্ত হলেন। আর দেশের অগণ্য সাধারণ মানুষ ইসলামি ধুয়োর অর্থহীনতাও স্বল্পকালে উপলব্ধি করতে পারলেন। অর্থনৈতিক লাভ অথবা হতাশা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা অথবা অমর্যাদা দুই দশকের মধ্যেই পূর্ব বাংলার মানুষকে ধর্মীয় অন্ধতা থেকে মুক্তি দান করে।
অথচ ধর্ম হচ্ছে পাকিস্তানের জন্মের মূল ভিত্তি এবং দুটি স্বতন্ত্র ভাষাভাষী জাতির একমাত্র ঐক্যসূত্র। সেই ধর্মকে দৃঢ়মূল না করতে পারলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য। মিথ্যার ওপর রচিত সৌধকে বহু মিথ্যার পিলার গেঁথে টিকিয়ে রাখতে হয়। অত্যন্ত ধূর্ত এবং ধুরন্ধর মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর চেলাদের ধর্মের চোরাবালির ওপর নির্মিত পাকিস্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভালোভাবে জানা ছিলো। তাঁরা জানতেন দৃঢ়তর কোনো বন্ধনের অভাবে ধর্মের আপাত সঙ্গতি দিয়ে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের কেবল একটা তাৎক্ষণিক মিলন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু পূর্ব বাংলার সঙ্গে গভীরতর যোগ পশ্চিম বাংলার ৷ সে যোগ বহু শতাব্দীর; সে যোগ ভাষার, সাহিত্যের, পোশাক-পরিচ্ছদের, শিক্ষাদীক্ষার, রুচি-রুজির—এক কথায় মনের ও সংস্কৃতির। অমিল কেবল ধর্মীয় আচারের। মতানৈক্য ও পরিণামে একটা সংঘর্ষ ঘটাতে সে অমিলটুকু সময়বিশেষে হয়তো যথেষ্ট হতে পারে; কিন্তু আধুনিক যুগে জীবন-যুদ্ধে মানুষ যখন একান্ত বিপর্যস্ত, ধর্মের প্রকোপ তখন প্রতিদিন ক্ষীয়মাণ। বর্তমান সমাজে বরং অর্থনৈতিক সাম্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে সুনিশ্চিত করে। অতএব পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক ঐক্য পাকিস্তানের ঐক্যের প্রতি বিরাট প্রতিবন্ধক এবং অব্যাহত ঝুঁকি। পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার এ হেন যোগসূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তাদের মূলধন ও প্রচারের বিষয় হলো পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের ধর্মীয় ঐক্য এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার ধর্মীয় অসঙ্গতি। পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই এই নীতির ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখতে পাই সরকারি কার্যকলাপে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিক্ষেত্রে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments